করোনায় বড় ধাক্কাটা লাগবে এশিয়ার এভিয়েশনে

0

উহান করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে বিভিন্ন দেশ ভ্রমণের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি এবং বিভিন্ন বিমানসংস্থা তাদের ফ্লাইট বাতিলে বাধ্য হচ্ছে। এরই মধ্য বিশ্বের প্রায় ৬০ টি বিমানসংস্থা চীনের মূল ভূখন্ডে তাদের ফ্লাইট স্থগিত করেছে। জানুয়ারি শেষ সপ্তাহে ৬ দিনেই বাতিল করা হয় ১০ হাজার ফ্লাইট। এক অর্থে বলা চীন বাকি বিশ্ব থেকে আকাশপথে এখন অনেকটা বিচ্ছিন্ন।

অর্থনীতিবিদ মতে, করোনাভাইরাসে সৃষ্ট পরিস্থিতির কারণে বিশ্ব অর্থনীতিকে যে বড় ধরনের মন্দার মধ্য দিয়ে যেতে হবে সে ব্যাপারে কোন সন্দেহ নেই । তবে যেই অঞ্চল থেকে এই প্রাদুর্ভাবের শুরু সেই অঞ্চল হল এশিয়া। বিশেষজ্ঞদের মতে, করোনার প্রভাবে সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক ক্ষতির মুখে পড়তে যাচ্ছে এশিয়ার অর্থনীতি। আর সেই তালিকায় প্রথমেই চলে এসেছে এভিয়েশন খাত ।

উহান করোভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের খবর জানুয়ারির মাঝামাঝি থেকে পেতে শুরু করে বিশ্ব এবং এখনও এটি কমার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। এই রোগের বিস্তার ঠেকাতে চীনসহ আশপাশের বেশ কয়েকটি দেশে জারি হয়েছে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা। করোনাভাইরাস রোগী শনাক্ত হওয়ার পর সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ড, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, হংকংয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্যগুলোতে ভ্রমণকারীর সংখ্যা অনেক কমেছে।

চীনে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের ফ্লাইট বন্ধ ঘোষণা
চীনে ব্রিটিশ এয়ারওয়েজের ফ্লাইট বন্ধ ঘোষণা

আভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক ভ্রমণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হওয়ায় নিষেধাজ্ঞার পর এভিয়েশন খাত এখন তার সবচেয়ে বাজে সময় পার করছে। এক্ষেত্রে এশিয়ার এয়ারলাইন্সের দুর্ভাগ্য হল, তারা নিজেদের আবিস্কার করেছে দূর্যোগের কেন্দ্রে যেটি তাদের সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ।

করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের প্রেক্ষিতে এর মধ্যে সংকটে পড়ার কখা জানিয়েছে দিয়েছে বিভিন্ন বিমানসংস্থা। শুধু তাই নয় সংকট মোকাবেলায় কর্মী ছাটাই, বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানোর মতো কঠাের পদক্ষেপের কথাও তারা ঘোষণা করেছে।

সংকট মোকাবেলার পদক্ষেপ হিসেবে হংকংয়ের জাতীয় বিমানসংস্থা ক্যাথে প্যাসিফিকের কর্মীদের তিন সপ্তাহের বিনা বেতনে ছুটি নিতে হবে। আগামী মার্চ থেকে জুনের মধ্যে এই অবৈতনিক ছুটি সংস্থাটির পাইলট, কেবিনক্রুসহ ২৭ হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারির সবাইকে পালাক্রমে ভোগ করতে হবে ।

বিমানসংস্থাটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) অগাস্টাস ট্যাং কর্মকর্তা-কর্মচারির উদ্দেশ্য এক ভিডিও বার্তায় এই ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, নতুন করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের ফলে ক্যাথে প্যাসিফিক সংকটের মুখোমুখি হয়েছে।

করোনাভাইরাসের প্রেক্ষিতে সংকট মোকাবেলায় ক্যাথে প্যাসিফিকের কর্মীদের নিতে হবে তিন সপ্তাহের বিনা বেতনে ছুটি
করোনাভাইরাসের প্রেক্ষিতে সংকট মোকাবেলায় ক্যাথে প্যাসিফিকের কর্মীদের নিতে হবে তিন সপ্তাহের বিনা বেতনে ছুটি

চীনে করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের কারণে ব্যবসায় মন্দা ঠেকাতে ৪০০ কর্মীকে ছাঁটাই করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে হংকংয়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম বিমান সংস্থা হংকং এয়ারলাইন্স । “হংকং এয়ারলাইন্সের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত এর চেয়ে বেশি চ্যালেঞ্জের সময় আর কখনও হয়নি। এই সিদ্ধান্ত কঠিন তবে এয়ারলাইনকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে,” বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেন বিমানসংস্থাটির একজন মুখপাত্র।

অন্যদিকে চীনের তিয়ানজিনে অ্যাসেম্বলিং কারখানা (চূড়ান্ত অ্যাসেম্বলিং লাইন) বন্ধ করে দিয়েছে উড়োজাহাজ নির্মাণের বিশ্বখ্যাত সংস্থা এয়ারবাস। কারখানাটি আবার চালুর কোন তারিখও দেয়নি সংস্থাটি।

এই দূর্যোগের প্রভাব পড়বে এই সপ্তাহের সিঙ্গাপুর এয়ার শো’তে । ধারনা করা হচ্ছে, এতে অংশ নেয়া সম্ভাব্যদের তালিকা ছোট হয়ে যাবে। রয়টার্স জানায়, এই অনুষ্ঠানে ৭০ টির মত প্রতিষ্ঠান অংশ না নেয়ার কথা নিশ্চিত করেছে।

তবে এসব কোন ছোটখাটো পর্যায়ের সংস্থা বা কোম্পানি নয়। যেসব দেশ এশিয়ার কয়েকটি দেশে ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে এমন কয়েকটি দেশ থেকে সিঙ্গাপুর এয়ার শো’তে অংশ না নেয়ার বিষয়টি জানানো হয়েছে। যেমন: দুইটি প্রধান মার্কিন প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান লকহিড মার্টিন এবং রেইথিওন এ বছর উপস্থিত থাকবে না বলে নিশ্চিত করেছে।

করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের কারণে চীনের তিয়ানজিনে অ্যাসেম্বলিং কারখানা বন্ধ করে দিয়েছে এয়ারবাস
করোনাভাইরাস প্রাদুর্ভাবের কারণে চীনের তিয়ানজিনে অ্যাসেম্বলিং কারখানা বন্ধ করে দিয়েছে এয়ারবাস

এদিকে সিঙ্গাপুর এয়ার শো-তে মার্কিন সরকারও তাদের উপস্থিতি আগের চাইতে কমানোর কথা জানিয়েছে। প্রতিরক্ষা বিভাগের আন্ডার সেক্রেটারি এলেন লর্ড, এই শোতে উপস্থিত থাকার কথা থাকলেও পরে সিদ্ধান্ত বদলানোর কথা জানান। তবে মার্কিন ডিপার্টমেন্ট অব স্টেট-এর রাজনৈতিক-সামরিক বিষয়ক সহকারী সচিব আর ক্লার্ক কুপার সাংবাদিকদের নিশ্চিত করেছেন যে উপস্থিতি কমালেও যুক্তরাষ্ট্র থেকেই এই এয়ার শোতে সবচেয়ে বড় আন্তর্জাতিক প্রতিনিধিদল থাকবে ।

রবিবারের এক তথ্য বিবরণীতে এয়ার শো-র কর্তৃপক্ষ জানায়, এবারে অনুষ্ঠানে বাণিজ্যিকভাবে ৪৫ হাজার উপস্থিতি নিশ্চিত হওয়া গেছে যা গেছে যা ২০১৮ এর তুলনায় ৯ হাজার কম।

এভিয়েশন রিভিউয়ের মতে, উহান করোভাইরাসের প্রাদুর্ভাব কতদিন চলবে তার উপর নির্ভর করছে এশিয়ার বিমান শিল্প কতটা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ২০০৩ সালে সার্সের প্রাদুর্ভাবের সময় এভিয়েশন খাত ৭ বিলিয়ন ডলারেরও বেশি লোকসান গুণেছিল। আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের মতে এই ৭ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চলের বিমানসংস্থাগুলোকেই নিতে হয়েছিল ৬ বিলিয়ন ডলারের লোকসান।

তবে সার্স থেকেও উহান করোভাইরাসের আর্থিক আঘাত অনেক বেশি ভয়াবহ হবে বলে আশংকা করা হচ্ছে । এর প্রভাব এরমধ্যে চীনের শেয়ার বাজারে পড়েছে। যদিও এই ধাক্কায় বড় বিমান সংস্থাগুলো নিজেদের ধীরে ধীরে সামাল দিয়ে উঠতে পারবে ছোটখাট সংস্থাগুলোর জন্য ধাক্কাটা হবে বেশ মারাত্মক।

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

Loading...