করোনাকালের একজন মানবিক রাষ্ট্রদূতের গল্প

0

দার্শনিক এ পি জে আবুল কালাম বলেছিলেন,‘স্বপ্ন সেটা নয় যা মানুষ ঘুমিয়ে দেখে বরং স্বপ্ন সেটা যা মানুষকে ঘুমাতেই দেয় না’। গেল বছর চীনের উহান থেকে পৌরাণিক দৈত্যের মতো অদৃশ্য এক অণুজীব এক লহমায় যখন গোটা পৃথিবীকে গ্রাস করে ফেলে, মৃত্যুর মিছিলে যোগ হয় হাজার, লক্ষ নাম, মুখ থুবরে পড়ে মানবতা-তখনই ওঠে আসে অনেক বিশুদ্ধ, নিবেদিতপ্রাণ মানবিক মানুষের গল্প। তেমনই একজন মানবিক, কর্তব্যপরায়ণ কূটনীতিক জর্ডানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত নাহিদা সোবহান। তাঁরই মানবিকতা, কর্তব্যপরায়ণতা আর সাহসী উপাখ্যান নিয়ে এই প্রবন্ধ।

করোনাকালে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারী মানবিক পুলিশ, সম্মুখসারির করোনাযোদ্ধা, চিকিৎসক, মাঠ প্রসাশন, সেবা মনস্ক ব্যাংক কর্মকর্তা এমনকি শিক্ষার্থী যারা নিঃস্বার্থে দাঁড়িয়ে ছিল দেশের মানুষের পাশে। মিডিয়া আর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বদৌলতে তাদের গল্প ভাইরাল হয়েছে দেশ-প্রবাসে। কিন্তু করোনাকালে প্রবাসের মানবিকতার গল্প কতাটা কানে বেজেছে আমাদের। এমনিতেই তো দেশের সীমানার বাইরে প্রবাসীদের ডাক আমরা দেরিতে শুনতে পাই। আমাদের দূতাবাসগুলোর দায়বদ্ধতা নিয়ে আমার সবাই উচ্চকিত থাকি। কিন্তু করোনাকালে মানবিক রাষ্ট্রদূতের কথা কতটুকু উঠে এসেছে বা জানাজানি হয়েছে? অবশ্য নিজ ঘরেই যখন নিত্য মৃত্যুধ্বনি তখন আর ফুরসৎ কোথায় দূরের বিউগল শোনা বা মানবিকতার গল্প জানার।

জর্ডানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত নাহিদা সোবহান, মধ্যপ্রাচ্যে নিযুক্ত প্রথম নারী রাষ্ট্রদূত। গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্বে যোগ দিয়ে জর্ডানের বাদশা দ্বিতীয় আবদুল্লাহ বিন আল-হুসাইনের কাছে পরিচয়পত্র পেশের দুই সপ্তাহের মধ্যেই করোনা প্রতিরোধে পুরো দেশে ঘোষণা করা হলো কারফিউ, সাথে লকডাউন।

জর্ডানের বাদশাহ আবদুল্লাহ বিন আল হুসাইনের কাছে পরিচয়পত্র পেশ করেছেন বাংলাদেশের নবনিযুক্ত রাষ্ট্রদূত নাহিদা সোবহান
জর্ডানের বাদশাহ আবদুল্লাহ বিন আল হুসাইনের কাছে পরিচয়পত্র পেশ করেছেন বাংলাদেশের নবনিযুক্ত রাষ্ট্রদূত নাহিদা সোবহান

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জাতিসংঘ অনুবিভাগে প্রায় তিন বছরের অক্লান্ত পরিশ্রম শেষে তখন তিনি ভেবেছিলেন হয়ত কয়েকটা দিন পাবেন সময় নিয়ে সুস্থভাবে দ্বিপাক্ষিক কূটনীতির পরিসরে কাজ করার পরিকল্পনা করবার। কিন্তু কথায় বলে ‘ঢেঁকি স্বর্গে গেলেও ধান ভানে’। তার জন্যও হলো তাই। জর্ডানে লকডাউন শুরু না হতেই বৈধ কাগজপত্রহীন বা অবৈধভাবে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিরা পড়লেন মহাবিপদে। কাজ নেই তাই আয়ও নেই। সহায়তার আশায় শুরু হলো দূতাবাসে ফোন যোগােযােগ। রাষ্ট্রদূত নাহিদা দ্রুত ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় অবহিত করেন এবং করোনায় অসহায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের মানবিক সহায়তার আবেদন জানান। সরকার থেকে পান সবুজ সংকেত।

মন্ত্রণালয় থেকে মানবিক সহায়তার অর্থ বরাদ্ধ দেয়ার আগেই রাষ্ট্রদূত নাহিদা সোবহান বাংলাদেশি কমিউনিটিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দূতাবাস কর্মকর্তা-কর্মচারিদের অক্লান্ত পরিশ্রমে তৈরি করলেন সাহায্য প্রত্যাশীদের বিশাল তালিকা। স্থান পায় জর্ডানের সব প্রদেশের সর্বস্তরের অসহায় প্রবাসী বাংলাদেশিরা। এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত বিশেষ করে খাদ্য সংকটে থাকা প্রবাসীদের অগ্রাধিকার দেয়া হয়।

 জর্ডানে করোনায় অসহায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের মাঝে ত্রাণ সহায়তা করছেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত নাহিদা সোবহান
জর্ডানে করোনায় অসহায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের মাঝে ত্রাণ সহায়তা করছেন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত নাহিদা সোবহান

তালিকা চূড়ান্ত করতে করতেই বার্তা এসে পড়ে সরকারি বরাদ্ধে। দেরি না করে তিনি শুরু করে দেন বিতরণের কর্মযজ্ঞ। কারফিউয়ের কারণে বাইরে বেরনোর নিষেধাজ্ঞা জারি ছিল। তাতে তিনি দমে থাকেন নি। থাকবেন বা কিভাবে, প্রতিদিন বাইরের হাজারো অসহায় প্রবাসীর আর্তনাদ যে তার কানে বাজছে। কূটনীতিক প্রিভিলেজ কাজে লাগিয়ে বিশেষ অনুমতি নিয়ে এবং কঠোর স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে দূতাবাসের মাত্র দুইজন কর্মকর্তাকে সাথে নিয়ে ছুটলেন এখানে সেখানে।

বাংলাদেশ সরকারের দেয়া খাদ্য সহায়তা নিয়ে মানবিক রাষ্ট্রদূত নাহিদা সোবহান সহকর্মীদের নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন প্রবাসীদের পাশে। করোনার ঝুঁকির মধ্যেই নিজে উপস্থিত থেকে জর্ডানের প্রতিটি এলাকায় গিয়ে বাংলাদেশি কর্মীদের মাঝে শুধু খাদ্য সহায়তা দিয়ে নজীর স্থাপন করেননি, বরং নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দৌড়ঝাঁপ করছেন যখন যেখানে প্রয়োজন। ‘একজন মানবিক,কর্তব্যপরায়ণ রাষ্ট্রদূত’ হিসেবে ঠাঁই করে নেন প্রবাসীদের মনের মণিকোঠায়।

জর্ডানে করোনা পরিস্থিতিতে অসহায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের ত্রাণ সহায়তা কার্যক্রম শুরু করেছে বাংলাদেশ দূতাবাস
জর্ডানে করোনা পরিস্থিতিতে অসহায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের ত্রাণ সহায়তা কার্যক্রম শুরু করেছে বাংলাদেশ দূতাবাস

গতবছর ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে ক্লান্তিহীন কাজ করে চলেছেন ১৫তম বিসিএসের মাধ্যমে ফরেন ক্যাডারে ক্যারিয়ার শুরু করা চৌকস কূটনীতিক নাহিদা সোবহান। অভিজ্ঞতা থেকেই তিনি জানতেন করোনার কারণে অর্থনৈতিক মন্দার ছোবল প্রথমেই পড়বে প্রবাসী শ্রমিকদের ওপর। তাই খাদ্য সহায়তার পাশাপাশি জোর কূটনীতিক চেষ্টা চালিয়ে গেলেন যেন বাংলাদেশি কোনো শ্রমিকের চাকরি হারাতে না হয়। জর্ডানের পোশাক শিল্পে কর্মরত শ্রমিকের অর্ধেকেরও বেশি বাংলাদেশি নারী কর্মী।

ইতোমধ্যে খবর পেতে শুরু করলেন কোম্পানিগুলো কর্মী ছাঁটাইয়ের প্রক্রিয়া শুরু করেছে। সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টরি অফিসিয়ালি জানালো সম্ভাব্য প্রায় চার হাজার বাংলাদেশি কর্মী ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত। এই কথা জানতে পেরে তিনি দ্রুতই তার কর্মপরিকল্পনা ঠিক করলেন। শুরু হলো আরেক অধ্যায়। কারফিউয়ের মধ্যেই কখনো একা কখনো পুলিশ নিয়ে দৌড়ে বেড়িয়েছেন জর্ডানের আম্মান থেকে আকাবা অবধি। দেখা করলেন জর্ডানের গুরুত্বপূর্ণ সব কোম্পানির মালিকদের সঙ্গে। রিক্রুটিং এজেন্সির মালিকদের সঙ্গে বৈঠক করলেন একাধিকবার। জর্ডান সরকারের শ্রম মন্ত্রণালয়ের সচিবের সঙ্গে দেখা করে অনুরোধ জানালেন যেন কোম্পানিগুলো হঠাৎ করে কোনো সিদ্ধান্ত না নিতে পারে সেই জন্য সহায়তা করা।

জর্ডানের ক্লাসিক ফ্যাশনের বাংলাদেশি কর্মীদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখছেন রাষ্ট্রদূত নাহিদা সোবহান
জর্ডানের ক্লাসিক ফ্যাশনের বাংলাদেশি কর্মীদের উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখছেন রাষ্ট্রদূত নাহিদা সোবহান

রাষ্ট্রদূতের একটাই চাওয়া কোনোভাবেই বাংলাদেশি কোনো কর্মী ছাঁটাই করা চলবে না। কারণ একজন প্রবাসীকর্মী সঙ্গে তার পরিবারের ভরনপোষণ শুধু নয়, বাংলাদেশে রেমিট্যান্স প্রবাহও সম্পৃক্ত। দূতাবাসের দৃঢ়তায় অবশেষে কোম্পানিগুলো সরে আসে কর্মী ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত থেকে। আর যে সমস্ত ছোট কোম্পানি দেউলিয়া ঘোষণা করেছে তাদের থেকে বাংলাদেশি কর্মীদের পাওনা আদায় এবং অন্য কোনো কোম্পানি কর্মসংস্থানের বিষয়টিও দূতাবাস নিশ্চিত করেছে । ততদিনে কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যেসহ বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে ফ্লাইট বোঝাই করে দেশে ফেরা শুরু করেছে চাকরি হারানো প্রবাসী বাংলাদেশিরা। কিন্তু ব্যতিক্রম কেবল জর্ডান!

করোনাকালে জর্ডান থেকে বৈধ একজন কর্মীও বাধ্যতামূলক চাকরি হারিয়ে দেশে ফেরেননি। যে কোম্পানি চার হাজার বাংলাদেশি কর্মীর ছাঁটাইয়ের সিদ্ধান্ত জানিয়েছিল, তারা ১৮৭ জন বাংলাদেশির প্রত্যাবর্তনের জন্য দূতাবাসের কাছে বিশেষ ফ্লাইটের ব্যবস্থার অনুরোধ জানালে দূতাবাস বাংলাদেশিদের সাথে কথা বলে নিশ্চিত হয় যে কর্মচুক্তির মেয়াদ শেষ করে তারা স্বেচ্ছায় দেশে ফিরতে চায়।

বাংলাদেশ-জর্ডান সর্ম্পক জোরদার এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্বার্থ সংরক্ষণে দেশটির মন্ত্রী, জনপ্রতিনিধি এবং উচ্চ পর্য়ায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে রাষ্ট্রদূত নাহিদা সোবহান
বাংলাদেশ-জর্ডান সর্ম্পক জোরদার এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্বার্থ সংরক্ষণে দেশটির মন্ত্রী, জনপ্রতিনিধি এবং উচ্চ পর্য়ায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে রাষ্ট্রদূত নাহিদা সোবহান

করোনা প্রাদূর্ভাব প্রতিরোধে রাণী আলিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে নিয়মিত বাণিজ্যিক ফ্লাইট চলাচল বন্ধ তখনও। বাংলাদেশ দূতাবাস ৭টি বিশেষ ফ্লাইটের ব্যবস্থা করে যারা চুক্তির মেয়াদ শেষ করেছে এবং স্বেচ্ছায় দেশে ফিরতে চাওয়া প্রবাসীদের জন্য। দূতাবাসের কর্মকর্তাদের রাষ্ট্রদূত নির্দেশ দিলেন প্রতিটি ফ্লাইট যাওয়ার সময় তারা যেন এয়ারপোর্টে থেকে পুরো ব্যবস্থাটি তদারকি করে। কারণ এই প্রবাসী কমীদের দেখার জন্যই দূতাবাস। নির্বিঘ্নে খুবই সুচারুরূপে সম্পন্ন হয় প্রবাসীদের স্বেচ্ছায় দেশে ফেরার কাজ। এরপর দেশে আটকেপড়া প্রবাসীদের জর্ডানে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য রাষ্ট্রদূত জোর কূটনীতিক প্রচেষ্টা চালালেন। অবশেষে জর্ডান সরকার সম্মত হলো তাদের ফিরিয়ে নিতে।

সবচেয়ে খুশির খবরটি এলো বছরের শেষ দিকে জর্ডানের একটি ফ্যাক্টরিই আগামী এক বছরে ১২ হাজার পোশাক কর্মী নেবে বাংলাদেশ থেকে। আরও অন্য ফ্যাক্টরিসহ এটা প্রায় ১৫ থেকে ২০ হাজার হবে। ঢাকার পত্রিকায় খুবই ফলাও করে প্রচার হল এই সংবাদ। উচ্ছ্বসিত সবাই। কিন্তু কজন আর জানে এর পেছনের গল্প! কতটা শ্রম আর দৃঢ়তায় এসেছে এই সাফল্য!

বাংলাদেশ-জর্ডান সর্ম্পক জোরদার এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্বার্থ সংরক্ষণে দেশটির মন্ত্রী, জনপ্রতিনিধি এবং উচ্চ পর্য়ায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে রাষ্ট্রদূত নাহিদা সোবহান
বাংলাদেশ-জর্ডান সর্ম্পক জোরদার এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্বার্থ সংরক্ষণে দেশটির মন্ত্রী, জনপ্রতিনিধি এবং উচ্চ পর্য়ায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে রাষ্ট্রদূত নাহিদা সোবহান

রাষ্ট্রদূত নাহিদা সোবহানের কাছে জানতে চেয়েছিলাম দূতাবাস নিয়ে তার পরিকল্পনা কথা? বললেন ‘দূতাবাসকে প্রবাসীদের আস্থার জায়গায় নিয়ে যাওয়া। বাংলাদেশ দূতাবাস আম্মানকে একটি মডেল দূতাবাস হিসেবে দাঁড় করানো।’ স্বচ্ছ আর্থিক ব্যবস্থাপনা, কার্যকর মনিটরিং ও দক্ষ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দূতাবাসকে মানুষের কাছাকাছি নিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়ে তিনি আরও বললেন, ‘দেখেন দূতাবাস সব মানুষকে খুশি করতে পারবে না, সেটা করার কোনো সুযোগও নেই। কিন্তু আমি এটা নিশ্চিত করব দূতাবাস তার কাজটি সঠিকভাবে করবে।

ইতোমধ্যেই কনসুলেট সেবার মান ও পরিধি বাড়ানোসহ আম্মান দূতাবাসে অনেক পরিবর্তন এনেছেন তিনি। যার সুফল ভোগ করছেন জর্ডানপ্রবাসী বাংলাদেশিরা। দূতাবাসে আগত সেবা প্রার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত বসার ব্যবস্থা, তথ্য ও অভ্যর্থনা ডেস্ক স্থাপন, পেশাদার নিরাপত্তা কর্মী নিয়োগ, সেবা গ্রহীতাদের দূতাবাসে আসার সাথে সাথে তার নির্দিষ্ট সেবা বিষয়ে অবহিতকরণ এবং নির্দিষ্ট কাউন্টারে প্রেরণ, পুরো সেবাগ্রহণ কার্যক্রমটি সিসি ক্যামেরায় মনিটরিং করা, কিউ ম্যাট্রিক মেশিনের মাধ্যমে সেবা গ্রহীতাদের সেবা বিন্যাস ও সেবা প্রদান, অভিযোগ ব্যবস্থাপনা চালুকরণ, বিশুদ্ধ পানীয় জলের ব্যবস্থা, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন ও নারী ও পুরুষের পৃথক প্রসাধানাগারের ব্যবস্থা, একসাথে কয়েকশ সেবাপ্রার্থীর জন্য বসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রতিটি পরিবর্তনেই ফুটে উঠেছে পেশাদারিত্বের ছাপ। এছাড়া আরও অনেক কিছুই আছে বাস্তবায়নাধীন। প্রবাসীদের অনেক দিনের দাবি ছিল দূরদূরান্তে গিয়ে সেবা প্রদান। সেটি তিনি আসার পরপরই চালু করেছেন। বিভিন্ন প্রদেশে গিয়ে দেয়া হচ্ছে কনসুলেট সেবা।

জর্ডানে শেখ কামালের স্মরণে দাবা প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া প্রতিযোগীদের সঙ্গে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত নাহিদা সোবহান
জর্ডানে শেখ কামালের স্মরণে দাবা প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া প্রতিযোগীদের সঙ্গে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত নাহিদা সোবহান

এছাড়া করোনা নিষেধাজ্ঞা শিথিলের পর থেকেই তিনি দূতাবাসের উদ্যোগে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে সিরিজ ওয়েবিনার, বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতীয় দিবসের কর্মসূচি, প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সচেতনতামূলক কর্মশালাসহ নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করে যাচ্ছেন।

জর্ডান-বাংলাদেশ ভ্রাতপ্রতিম দুদেশের সর্ম্পক আরও জোরদার, বাংলাদেশের উজ্জ্বল ভাবমূর্তি নির্মাণ, সেসঙ্গে বিনিয়োগ সহযোগিতা ও বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং শ্রম বাজার সম্প্রসারণ ও প্রবাসী বাংলাদেশিদের স্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়ে সবধরেনের কূটনৈতিক তথ্যপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন রাষ্ট্রদূত নাহিদা। করোনাকালেও মধ্যেও তিনি দেশটির একাধিক মন্ত্রী, জনপ্রতিনিধি এবং উচ্চ পর্য়ায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন এসব বিষয় নিয়ে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীন বিদেশে অবস্থিত প্রায় ৭৫টি মিশনের মধ্যে আম্মান দূতাবাস খুব ছোট একটি মিশন। রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে পররাষ্ট্র ক্যাডারের একজন মাত্র কর্মকর্তা এবং শ্রম উইং-এর একজন কর্মকর্তা। ড্রাইভার মালিসহ সর্বমোট জনবল ১৯ জন। ক্ষুদ্র জনবল নিয়ে রাষ্ট্রদূত নাহিদা সোবহান যেভাবে প্রায় দেড় লাখ প্রবাসী বাংলাদেশির জন্য মানবিক দূতাবাসে রূপান্তরিত করছেন তা সত্যিই অকল্পনীয়। সদিচ্ছা থাকলে যে সম্পদ ও জনবলের সিমাবদ্ধতাকে ছাড়িয়ে যেতে পারে নাহিদা সোবহান তা ই প্রমাণ করলেন।

জর্ডানের বাংলাদেশ দূতাবাস উদ্যোগে ‘স্বাধীনতা ও বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা’ শীর্ষক ওয়েবিনার
জর্ডানের বাংলাদেশ দূতাবাস উদ্যোগে ‘স্বাধীনতা ও বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা’ শীর্ষক ওয়েবিনার

ডাক্তার বাবার সন্তান হিসেবে স্বাভাবিক ছিল ডাক্তারি পেশা বেছে নেয়া কিন্তু নািহিদা সোবহান সেদিকে না গিয়ে নিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে উচ্চতর ডিগ্রী। ইংরেজি মাধ্যম কিছুদিন শিক্ষকতাও করে চলে এলেন পররাষ্ট্র ক্যাডারে। এরপর তার বিরামহিন ছুটে চলা। রাষ্ট্রদূত হিসেবে দেশের পতাকা হাতে তুলে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী যে দায়িত্ব তাকে দিয়েছিলেন প্রতিনিয়ত তার যথার্থতা প্রমাণ করে চলেছেন তিনি। প্রথাগত কূটনীতির বাইরে না গিয়েও তার মানবিক দূরদৃষ্টি ও সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যের কারণে তিনি দূতাবাসকে মানুষের ভরসার জায়গা হিসেবে তৈরি করতে পেরেছেন। বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের স্বার্থ সুরক্ষা এবং ভাবমূর্তি বিনির্মাণে তার মতো রাষ্ট্রদূতরা কাজ করছেন বলেই এত কিছুর পরও মানুষ মানুষে আস্থা রাখে। ঘোর অমানিশার পরেও মানুষ ভোরের আলোর অপেক্ষা করে।
জর্ডানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত নাহিদা সোবহান
জর্ডানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত নাহিদা সোবহান

শত মন খারাপের ভিড়েও যখন এ ধরনের মানুষদের কথা ভাবি তখন মনে হয় ‘আজ না হোক কাল, না হয় পরশু ভোর ঠিক আসবেই। সেদিন আর খুব বেশি দূরে নয় যখন লাল সবুজের পতাকা সব কাল মেঘ ভেদ করে মাথা তুলবে আকাশ পানে। আমাদের সোনার বাংলা ভরে উঠবে সোনার মানুষদের কর্মকাণ্ডে। অভিবাদন একজন পেশাদার কূটনীতিক, মানবিক রাষ্ট্রদূত নাহিদা সোবহানকে তার দেশপ্রেম ও কর্মউদ্দীপনার জন্য।

লেখক : প্রবাসী সাংবাদিক ও কলামিস্ট, আন্তর্জাতিক সম্পাদক আকাশযাত্রা

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

আপনার মন্তব্য লিখুন