মুখে রেমিট্যান্সযোদ্ধা,বাস্তবে ‘কামলা’ প্রাপ্তি!

0

কোরিয়াপ্রবাসী মাসুদ রানা, চলতি বছরে জানুয়ারিতে ছুটিতে যান। ছুটিতে গিয়ে আটকে পড়েন বাংলাদেশে, করোনার প্রকোপের কারণে কোম্পানির ছুটি মোতাবেক আসতে পারেনি, অনেক কষ্ট করে দীর্ঘ ছয় মাস পরে কোরিয়ায় আসেন। কিন্তু কোম্পানিতে কাজ নেই, মালিক জানাল, বাসায় দুই মাস বিশ্রাম নিতে। মাসুদ রানা জানায়, আমি দেশে গিয়ে অনেক ধার দেনা করে জীবন নির্বাহ করেছি, কোরিয়া এসে দেখি কোম্পানিতে কাজ নেই।

করিম দুবাইপ্রবাসী বাংলাদেশি। একটি অভিজাত শপে চাকরি করছিলেন। ভালোই চলছিল কর্মজীবন। কিন্তু করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবে গত মার্চ থেকে সবকিছু পালটে গেছে। বন্ধ হয়ে গেছে শপটি কর্মহীন হয়ে পড়েছেন করিম। আইনের কঠোরতা ও নানা বিধিনিষেধের কারণে অন্য কোনো কাজও করতে পারছে না। আগের আয় থেকে যে সামান্য অর্থ জমা ছিল, তা-ও শেষ। ধার-দেনা করে এখন দুর্বিষহ জীবন কাটাচ্ছেন। দেশে ফেরত আসা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই করিমের সামনে। কিন্তু দেশে এসেইবা কী করবেন, এ নিয়ে দুশ্চিন্তা পিছু ছাড়ছে না তার।

একই অবস্থা লেবাননপ্রবাসী সাব্বির হোসেনের। কাজ করছিলেন একটি কটন কোম্পানিতে। করোনা প্রকোপের কারণে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ। সাব্বিরের মত একই অবস্থা সৌদিপ্রবাসী রহিমের কাজ করতেন লন্ড্রি দোকানে কিন্তু করোনার কারণে হজ্জে লোক কম একই সাথে ওমরাহ বন্ধ থাকায় বছরের শুরু থেকেই কাজ নেই। ফলে বেকার।

সৌদি প্রবাসী শাহনেওয়াজ যেন চোখে মুখে অন্ধকার দেখছেন, চার সন্তানের খরচ ও ঋণ করে জমি বন্ধক রেখে পাঁচ লাখ টাকা খরচ করে সৌদি এসেছেন। কয়েকমাস কাজ করলেও এখন চাকরি হারা, মোট ছয়জনের সংসার। দেশে গিয়ে কী করবে? কীভাবে চলবে? সামনে সব অন্ধকার দেখছি। এমনটাই জানান শাহনেওয়াজের মতো বিশ্বব্যাপী লাখ লাখ প্রবাসী এখন বেকার হয়ে দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন। দুশ্চিন্তায় নির্ঘুম রাত কাটাচ্ছেন ভবিষ্যতের চিন্তায়।

বলাবাহুল্য, করোনায় কাজ হারিয়ে প্রতিদিনই দেশে ফিরছেন প্রবাসীরা। আবার কেউ অপেক্ষায় রয়েছেন ফিরে আসার। ছুটিতে এসেও আটকা পড়েছেন অনেকে। নতুন কর্মী যাওয়াও একরকম বন্ধ। তা সত্ত্বেও বেড়েছে রেমিট্যান্স। শুধু তাই নয় অতীতের রেকর্ড ছাড়িয়েছে প্রবাসী আয়। জুলাই এবং আগস্টে ৩০৪ কোটি ডলার পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। যা আগের অর্থবছরের এই সময়ের চেয়ে যা ৫০ ভাগ বেশি। বিভিন্ন গণমাধ্যম প্রতিবেদনে উঠে আসে এ বছরের আগস্টে ৩৬ শতাংশ বেশি রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। এই বাড়তি রেমিট্যান্স আসছে টানা তিন মাস ধরে। জুলাই-আগস্ট সময়কালে বার্ষিক ৫০ শতাংশ প্রবৃদ্ধিতে রেমিট্যান্স এসেছে চার দশমিক ৫৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।

গত সপ্তাহ রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৩৮ দশমিক ৯০ বিলিয়ন ডলার, যা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে রেকর্ড। চলতি অগাস্ট মাসের ২০ দিনে ১৩৪ কোটি ১০ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা এমনটি জানা যায় গণমাধ্যমসূত্রে। গত বছরের পুরো অগাস্ট মাসে ১৪৪ কোটি ৪৭ লাখ ডলার রেমিট্যান্স এসেছিল দেশে। আগের মাস জুলাইয়ে ২৬০ কোটি ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছিলেন প্রবাসীরা। বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে কখনই এক মাসে এত বেশি রেমিট্যান্স আসেনি। এর আগে এক মাসে সবচেয়ে বেশি রেমিট্যান্স এসেছিল গত জুনে, ১৮৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার।

পরিবার ও দেশের প্রতি ভালোবাসা থেকে অমানবিক পরিশ্রম আর দৈনিক অতিরিক্ত সময় কাজ করে দেশে টাকা পাঠান প্রবাসীরা । যাতে দেশের অর্থনীতি সচল থাকে। অথচ এই প্রবাসীরা প্রতি পদে পদে হয়রানি শিকার হন। মুখে রেমিট্যান্সযোদ্ধা হিসেবে সম্মান দেখালেও,বাস্তবে ‘কামলা’র ব্যবহারই জুটে প্রবাসীদের ভাগ্যে। নিরীহ, দূর্বল প্রবাসীদের প্রতি নির্মম ব্যবহার। অথচ প্রবাসীরাও রক্ত মাংসে মানুষ।

যারা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রেখেছেন, রিজার্ভ বাড়িয়েছেন তাদের বোবাকান্না, কষ্ট দেখার যেন কেউ নেই। প্রবাসে কিছু কিছু দেশে বাংলাদেশ দূতাবাসে সাহায্যর জন্য গিয়ে করোনায় াসহায় প্রবাসীরা দূর্ব্যবহার ও নাজেহালের শিকার হওয়ার খবর কানে বাজে নিয়মিত। অবশ্য ব্যতিক্রমও আছে, অনেক দূতাবাসে এই সংকটে প্রবাসীদের পাশে দাঁড়িয়ে দৃষ্টান্তও রেখেছে।

বিশেষজ্ঞ ও খাত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এসব রেমিট্যান্সযোদ্ধার প্রতি অবহেলা নিঃসন্দেহে সংবিধান বিরোধী। সরকারের এখনই পদক্ষেপ নেওয়া উচিত, এমনটি মনে করছেন এই খাতের বিশারদরা। করোনাকালে এদের নিয়ে না ভাবলে এসব মানবসম্পদ সরকারের বোঝা হয়ে শুধু দাঁড়াবে না, সমাজে অস্থিরতা বাড়বে। দেশে আটকে পড়া প্রবাসীও প্রবাসে চাকরী হারাদের জন্য ন্যায়সম্মত বুদ্ধিবৃত্তিক পলিসি নির্ধারণ না করলে সামনে নিশ্চিত অন্ধকার।

লেখক : দক্ষিণ কোরিয়াপ্রবাসী ও আন্তর্জাতিক সম্পাদক-আকাশযাত্রা

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।