আজ বলতে পারতাম না ভালোবাসি “মা”

0

ফেব্রুয়ারি আমাদের প্রেরণার প্রতীক, আর এই ফেব্রুয়ারি মাসের ২১ তারিখ মহান আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। এই দিনটি জাতি গভীর শ্রদ্ধা আর ভালোবাসায় স্মরণ করে একুশের বীর শহীদদের। কালের পরিক্রমায় হয়তোবা এবারো কেউ ভুলবেনা বরং ৬৯ বছর আগে ভাষার জন্য জীবন দেয়া সালাম, বরকত, রফিক ও জব্বারদের শ্রদ্ধার চিত্তে স্মরণ করে থাকবে গোটা জাতি। এছাড়া এই দিনটি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে সারাবিশ্বেই যথাযথ মর্যাদায় পালিত হয়ে থাকে।

১৭৫৭ সালে যে সূর্য অস্তমিত হয়েছিল, সেই সূর্য প্রায় ১০০ বছর পর আবারো এদেশের আকাশে সূর্য উঠেছিল বটে কিন্তু ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান গঠনের পর পশ্চিম পাকিস্তানের রাজনীতিবিদরাই পাকিস্তান সরকারের প্রাধান্য পায়। পাকিস্তান সরকার ঠিক করে উর্দু ভাষাকে সমগ্র পাকিস্তানের জাতীয় ভাষা করা হবে, যদিও পূর্ব পাকিস্তানে উর্দু ভাষার প্রচলন ছিলো খুবই কম।

পূর্ব পাকিস্তানের বাংলা ভাষাভাষী মানুষ (যারা সংখ্যার বিচারে সমগ্র পাকিস্তানে সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিলেন) এই সিদ্ধান্তকে সেদিন মোটেই মেনে নিতে পারেনি। কিন্তু পুরোপুরি সকাল না হতেই পূর্ব পাকিস্তানে বাংলাভাষার সম-মর্যাদার দাবিতে তখন শুরু হয় তুমুল আন্দোলন। ১৯৫২ সালের ফেব্রুয়ারিতে পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর খাজা নাজিমুদ্দিনের ঘোষণার ফলে আন্দোলন আরো জোরদার হয়ে ওঠে। তখন পুলিশ ১৪৪ ধারা জারি করে মিটিং-মিছিল সবকিছু বে-আইনি ঘোষণা করে।

২১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫২ সালে এই আদেশ অমান্য করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ছাত্র, সাধারণ জনতা ও কিছু রাজনৈতিক কর্মীরা মিলে একটি মিছিল বের করেন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ-এর কাছে এলে পুলিশ মিছিলের উপর নির্বিচারে গুলি চালায়। প্রায় ১০০ বছর পূর্ব ইংরেজদের কাছে হারানো মাতৃভূমি এবং ১৯৫২ এসে আবার মাতৃভাষা কেড়ে নেয়ার যে চেষ্টা পাকবাহিনী করেছিল তাদের সকল জুলুম, অত্যাচার সবকিছু আবার বাংলা মায়ের দামাল সালাম, বরকত, রফিক ও জব্বারদের মত নাম না জানা আরো অনেক বাংলা মায়ের সন্তানরা জীবন দিয়ে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারকে বাধ্য করে বাংলা ও উর্দুভাষাকে সম-মর্যাদা দিতে।

১৯৫২ এর আন্দোলনের স্মৃতিতে পরবর্তীকালে গড়ে তোলা হয় শহীদ মিনার, যেখানে ভাষার জন্য প্রাণ দিয়ে ছিলেন সালাম, রফিক, বরকত, জব্বাররা। এর ফলে ২১শে ফেব্রুয়ারি দিনটি বাংলাদেশের ভাষা শহীদ দিবস হিসাবে পালিত হয় আসছে।

১৯৫২ সালের এই দিনটিতে বাংলার দামাল ছেলেরা মাতৃভাষা রক্ষার দাবিতে রাজপথে যে বীরত্ব দেখিয়েছিল সে কথা আজ কারো ভুলবার নয়।মাতৃভাষা রক্ষার জন্যে যে বুকের তাজা রক্তে রাজপথ রঞ্জিত করেছেন, যারা আমাদের প্রেরণার উৎস হিসেবে কাজ করেছেন, আমাদেরকে অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে শিখিয়েছেন, আমরা তাদেরকে শ্রদ্ধার সাথে আজো স্মরণ করি। তাদেরকে জানাই আমাদের অন্তরের অন্তস্থল থেকে হাজারো সালাম এবং তাদের আত্মার মাগফিরাতের জন্য রইলো অফুরন্ত দোয়া।

১৯৫২ সালে মাতৃভাষা বাংলার মর্যাদা রাখতে গিয়ে বুকের রক্ত ঢেলে সেদিন শৃঙ্খলমুক্ত হয়েছিল বর্ণমালা, আমার মায়ের বাংলা ভাষা। বাংলা ভাষা রক্ষার যে সংগ্রামের সূচনা সেদিন ঘটেছিল, সেই বীজ থেকে মুক্তিযুদ্ধের গৌরবময় পথ বেয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের মধ্য দিয়ে তা চূড়ান্ত পরিণতি লাভ করে। অমর একুশে ফেব্রুয়ারি তাই আমাদের কাছে চির প্রেরণার প্রতীকে পরিণত হয়েছে। মাতৃভাষার মর্যাদা রাখতে গিয়ে বুকের রক্ত ঢেলে বাংলার দামাল ছেলেরা যে ইতিহাস রচনা করেছিল, তা এখন শুধু বাংলাদেশে নয় সারাবিশ্ব তাকে বরণ করেছে সুগভীর শ্রদ্ধায়।

মহান ২১শে ফেব্রুয়ারি আজ বাংলা ভাষায় কথা বলা মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় ১৯৯৯ সাল জাতিসংঘ দিনটিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসাবে ঘোষণা করে। ২১শে ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের জন্য একটি অহঙ্কার ও গৌরবোজ্জল দিন। অন্যায়ের কাছে মাথানত না করার দিন, রক্তস্নাত ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবহ, বেদনা আর আত্মত্যাগের অহংকারে গৌরবোজ্জল ভাষা আন্দোলনের সেই শপথ যুগে যুগে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে, সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে আলোকবর্তিকার মতো মূর্ত হয়ে ওঠে। এখনও জাতির যে কোনো ক্রান্তিকালে ভাষা আন্দোলন আমাদের প্রেরণা যোগায়। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে ভাষা আন্দোলন জাতির বীরত্বপূর্ণ ঐতিহ্যের পরিচয় তুলে ধরে।

তাই আসুন আমরা সবাই একটাই শপথ নেই, সকল ভেদাভেদ ভুলে আমাদের এই সুন্দর দেশটিকে আমরা আরো সুন্দর করে সাজাই।

লেখক : প্রবাসী সাংবাদিক ও কলামিস্ট

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।