স্যালুট টু গাম্বিয়া, শিক্ষা দিলে বিশ্বকে

0

মায়ানমারের সেনাবাহিনী দেশটির রাখাইন রাজ্যে মুসলমান ধর্মালম্বি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠির ওপর গণহত্যাসহ নানা মানবতা বিরোধী অপরাধ সংগঠন করে আসছিল কয়েক দশক ধরে। গণহত্যা থেকে বাচতে প্রায় ১২ লাখের মত রোহিঙ্গা দেশটি থেকে পালিয়ে প্রতিবেশী বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নেয়।

জাতিসংঘসহ নানা মানবাধিকার সংস্থা মায়ানমারের বিরুদ্ধে জাতিগত নিধনযজ্ঞের অভিযোগ করে আসলেও মুসলমান রোহিঙ্গাদের পক্ষে বিশ্বের কোন প্রভাবশালী মুসলিম দেশ দৃশ্যমান কোন পদক্ষেপ নেয় নি।
অবশেষে, পশ্চিম আফ্রিকার ক্ষুদ্র ও অক্ষ্যাত এক মুসলিম দেশ গাম্বিয়া এগিয়ে এল ত্রাতা হয়ে। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক আদালতে মায়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ এনে মামলা করল।

গতকাল মঙ্গলবার নেদারল্যান্ডসের দি হেগ শহরে অবস্থিত ‘দি ইন্টারন্যাশনাল কোর্ট অব জাস্টিস’ সেই মামলার শুনানি শুরু হয়েছে। যেখানে মায়ানমারের প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দিচ্ছেন দেশটির ফার্স্ট মিনিস্টার শান্তিতে নোবেল বিজয়ী অং সান সু’কি।

অনেক দেশই মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক আদালতে গণহত্যা বা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা করতে পারত। কিন্তু সবাই যখন আহা-উহু করে, নিন্দা জানিয়ে বিষয়টি পার করে দিচ্ছিল, ঠিক তখনই গণহত্যার মামলা করে গাম্বিয়া সবাইকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করল। আন্তর্জাতিক আদালতে রায় কী হবে, সেটা পরের বিষয়। কিন্তু গণহত্যার মামলা হওয়াটাই গুরুত্বপূর্ণ। এখন অন্তত প্রাতিষ্ঠানিকভাবে মিয়ানমারকে গণহত্যাকারী বলা যাবে। আবুবকর প্রমাণ করে দিলেন, একজন ব্যক্তিই ইতিহাসে ব্যবধান গড়ে দিতে পারেন।

দেশ হিসেবে গাম্বিয়া খুব বেশি প্রভাবশালী বা পরিচিত না। আফ্রিকার রাজনীতি বা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে গাম্বিয়ার কোনো প্রভাবের কথা তেমন শোনা যায় না। এমনকি ওআইসিতেও গাম্বিয়াকে বড় ধরনের শক্তি হিসেবে কেউ বিবেচনা করে না। তবে গাম্বিয়া মানবিকতার দিক থেকে এখন শীর্ষেই থাকবে। মানবাধিকার, সম-অধিকারের বিষয়ে এত দিন পশ্চিমাদেরই চ্যাম্পিয়ন বলে মনে করা হতো।

কিন্তু গাম্বিয়া সেই ধারণা পাল্টে দিল খানিকটা। দরিদ্র, ক্ষুদ্র দেশও যে মানবাধিকার, জন-অধিকারের পক্ষে কথা বলতে পারে, গাম্বিয়া তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। মনে হচ্ছে, সারা বিশ্বের কথাই বলছে গাম্বিয়া, ঠিক যখন গাম্বিয়া স্বৈরশাসকের আলখাল্লা ঝেড়ে ফেলতে চাইছে। দেশটিতে মানবাধিকার পরিস্থিতি উন্নত করার জন্যও কাজ করছে। এসবই গাম্বিয়াকে মানবিকতার জগতে এক অনন্য জায়গায় নিয়ে যাবে।

মিয়ানমারে বিরুদ্ধে মামলার মূল উদ্যোক্তা হচ্ছেন গাম্বিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল ও বিচারবিষয়ক মন্ত্রী আবুবকর তামবাদু। ২০১৮ সালে ওআইসির পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের ঢাকা বৈঠকে গাম্বিয়া পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে না পাঠিয়ে শেষ মুহূর্তে বিচারবিষয়ক মন্ত্রী আবুবকর তামবাদুকে পাঠায়। আবুবকর ওআইসির প্রতিনিধি দলের সঙ্গে কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শনে গিয়েছিলেন। দেশে ফিরে গিয়ে গণমাধ্যমে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে আবুবকর জানান, ‘রোহিঙ্গাদের প্রতিটি কথায় গণহত্যার কাহিনি লেখা আছে। আমি এখানে রুয়ান্ডার গণহত্যার সঙ্গে মিল খুঁজে পাই।’ রোহিঙ্গা গণহত্যার বিষয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে মামলা করার জন্য আবুবকর ওইআইসিতে প্রস্তাব উত্থাপন করেন এবং এই বছর ওআইসিকে মামলায় সহযোগিতা করতে সম্মত করেন। এভাবেই আবুবকর পশ্চিম আফ্রিকার এক ক্ষুদ্র দেশ গাম্বিয়াকে মানবাধিকারের ক্ষেত্রে সামনে নিয়ে আসেন।

গাম্বিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল ও বিচারবিষয়ক মন্ত্রী আবুবকর তামবাদু
গাম্বিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল ও বিচারবিষয়ক মন্ত্রী আবুবকর তামবাদু

আফ্রিকা মহাদেশের ক্ষুদ্রতম দেশ গাম্বিয়ার আয়তন মাত্র ১০ হাজর ৬৮৯ বর্গকিলোমিটার। রাষ্ট্রীয় নাম গাম্বিয়া ইসলামি প্রজাতন্ত্র। এটি উত্তর, পূর্ব ও দক্ষিণ দিকে সেনেগাল দ্বারা পরিবেষ্টিত। পশ্চিমে রয়েছে আটলান্টিক মহাসাগর। গাম্বিয়া নদী দেশটির মধ্যভাগ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে আটলান্টিক মহাসাগরে পতিত হয়েছে। গাম্বিয়া সাগর উপকূল থেকে প্রায় মহাদেশের প্রায় ৩২০ কিলোমিটার অভ্যন্তর পর্যন্ত চলে গেছে। তবে এর সর্বোচ্চ প্রস্থ মাত্র ৫০ কিলোমিটার। বন্দর শহর বাঞ্জুল দেশটির রাজধানী। সেরেকুন্দা দেশের বৃহত্তম শহর।

গাম্বিয়া একটি কৃষিপ্রধান দেশ। এখানকার বেশির ভাগ মানুষ দরিদ্র। চীনাবাদাম এখানকার প্রধান উৎপাদিত শস্য এবং প্রধান রপ্তানি দ্রব্য। পর্যটন শিল্প থেকেও আয় হয়। আটলান্টিক সাগরের উপকূলের সমুদ্রসৈকতগুলিতে ঘুরতে এবং গাম্বিয়া নদীর বিচিত্র পাখপাখালি দেখতে পর্যটকেরা গাম্বিয়াতে আসেন।

গাম্বিয়া ১৯শ শতকে একটি ব্রিটিশ উপনিবেশে পরিণত হয়। ১৯৬৫ সালে দেশটি স্বাধীনতা লাভ করে। স্বাধীনতার পর দেশটি একটি স্থিতিশীল গণতন্ত্র হিসেবে গণ্য হয়। ১৯৯৪ সালে একটি রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতিকে অপসারণ করা হয় এবং সামরিক নেতা ইয়াহিয়া জাম্মেহ তার স্থান নেন। জাম্মেহ পরবর্তীকালে গাম্বিয়ার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিজয়ী হন। ২০১৬ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে জামমেহকে পরাজিত করার পরে জানুয়ারী ২০১৭ সালে অ্যাডামা ব্যারো গাম্বিয়ার তৃতীয় রাষ্ট্রপতি হন।

কয়েক বছর আগে গাম্বিয়া উপনিবেশিক ধারা থেকে বেরিয়ে এসে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ঘোষণা করেছে। গাম্বিয়ার ৯৫ ভাগ মানুষ মুসলিম, বাকি ৫ ভাগ খ্রিস্টান বা অন্যান্য। তবে সংখ্যালঘুরা তাদের ধর্ম বাধাহীনভাবে পালন করতে পারে। ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ঘোষণার পর তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া জাম্মেহ রমজান মাসের পবিত্রতা রক্ষায় গাম্বিয়ায় নাচ-গান এবং ড্রামসহ সব ধরনের বাদ্যযন্ত্র বাজানো নিষিদ্ধ করেছিলেন।

জানা যায়, নবম ও দশম শতাব্দীতে গাম্বিয়া অঞ্চলে আরব ব্যবসায়ীদের আগমণ ঘটে। দশম শতাব্দীতে, মুসলিম বণিক এবং আলেমগণ পশ্চিম আফ্রিকায় বেশ কয়েকটি বাণিজ্যিক কেন্দ্র স্থাপন করেছিলেন। তারা ট্রান্স-সাহারান বাণিজ্য রুট স্থাপন করেছিলেন, যার ফলে এ অঞ্চল থেকে সোনা ও হাতির দাঁতের রফতানি করা হতো। পাশাপাশি বিভিন্ন তৈরি পণ্য আমদানি করা হত।

আর এভাবেই এক সময় ইসলামের ছায়াতলে আসে গাম্বিয়া। দেশটির অধিকাংশ মানুষ সুন্নী মুসলমান। তারা মূলত মালেকী মাযহাবের অনুসারী। তবে কিছু শিয়া মতালম্বীও রয়েছে।

নেদারল্যান্ডসের হেগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে অং সান সু চি
নেদারল্যান্ডসের হেগে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে অং সান সু চি

গাম্বিয়া আন্তর্জাতিক বিষয়ে বিশেষত পশ্চিম আফ্রিকান এবং ইসলামিক বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে থাকে। যদিও বিদেশে দেশটির সীমাবদ্ধ প্রতিনিধিত্ব রয়েছে। এর আগে লাইবেরিয়া এবং সিয়েরা লিওনের গৃহযুদ্ধের সমাধানে গাম্বিয়া সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে।

রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে মানবতা বিরোধী অপরাধের দায়ে মিয়ানমারকে দোষী প্রমাণিত করার চেষ্টায় গাম্বিয়ার অ্যাটর্নি জেনারেল ও বিচারমন্ত্রী আবুবকর মারি তামবাদু ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী মামাদু তাঙ্গারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছেন।

রুয়ান্ডার গণহত্যার বিষয়ে জাতিসংঘের আদালতে কাজের অভিজ্ঞতা আর সবার শেষে কক্সবাজারে রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলে গাম্বিয়ার বিচারমন্ত্রী আবুবকর মারি তামবাদু মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিক আদালতে নেওয়ার বিষয়টিকে সামনে নিয়ে আসেন।

গাম্বিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মামাদু তাঙ্গারা অতীতে দুই দফায় জাতিসংঘে তাঁর দেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ছিলেন। খুব স্বাভাবিকভাবে রোহিঙ্গা সংকটের বিষয়টি সম্পর্কে তিনি আগে থেকেই জানতেন। ফলে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনিও রোহিঙ্গাদের সুরক্ষায় তাঁর দেশের ভূমিকা রাখার বিষয়ে অগ্রণী ভূমিকা রাখেন।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গা ঢলের পর থেকেই এ সমস্যা নিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ আর আলোচনায় থেকেছে গাম্বিয়া। তৃতীয় দেশে প্রত্যাবাসনের ক্ষেত্রে রোহিঙ্গাদের একটি অংশকে নেওয়ার বিষয়টিও যে গাম্বিয়া ভাবছে তা বাংলাদেশকে জানিয়েছে দেশটি।

মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিকভাবে বয়কটের ডাক, কাঠগড়ায় উঠছেন সু চি
মিয়ানমারকে আন্তর্জাতিকভাবে বয়কটের ডাক, কাঠগড়ায় উঠছেন সু চি

গত বছরের মে মাসে ঢাকায় ওআইসি পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলনে গাম্বিয়ার বিচারমন্ত্রী আবুবকর মারি তামবাদু তাঁর দেশের নেতৃত্ব দেন। ঢাকায় বৈঠকে বসার আগে তিনি রোহিঙ্গা পরিস্থিতি দেখতে কক্সবাজার গিয়েছিলেন। পরে ২০১৮ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের ফাঁকে এক অনুষ্ঠানে মন্তব্য করেছিলেন রুয়ান্ডার গণহত্যার সঙ্গে তিনি রাখাইনে রোহিঙ্গাদের ওপর নৃশংসতার মিল খুঁজে পাচ্ছেন। কাজেই মিয়ানমারকে আদালতে নেওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই।

মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ গত সপ্তাহে তাদের এক বিশ্লেষণে বলেছে, সাবেক সেনা কর্মকর্তা ইয়াহিয়া জামেহর ২২ বছরের স্বৈরশাসনের সময়ের নেতিবাচক ছবি আর রুয়ান্ডার গণহত্যার বিচারে জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিশেষ সহকারী হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতার আলোকে মারি তামবাদু মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার মামলা করার সিদ্ধান্ত নেন।

২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রোহিঙ্গা ঢলের পর থেকেই মিয়ানমারের বিরুদ্ধে জোরালো পদক্ষেপের কথা ভাবতে শুরু করে ওআইসি। এ জন্য ইসলামি দেশগুলোর বৃহত্তম জোটটি আসিয়ানভুক্ত মুসলিম দেশ মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও ব্রুনেইকে কাজে লাগানোর চেষ্টা করে। কিন্তু এসব দেশ সেভাবে এগিয়ে আসেনি। অথচ রোহিঙ্গা ঢলের পরপরই মিয়ানমারের সংখ্যালঘু মুসলমানদের অধিকার নিয়ে উচ্চকণ্ঠে রয়েছে গাম্বিয়া। তাই ওআইসি মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আইনি পদক্ষেপ নিতে গাম্বিয়াকে সমর্থনের সিদ্ধান্ত নেয়।

বাংলাদেশে ২০১৮ সালের ৩০ ও ৩১ মে ওআইসি পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলন শেষে গৃহীত ঢাকা ঘোষণার ৪৭ নম্বর অনুচ্ছেদে ওআইসির পক্ষে গাম্বিয়াকে মামলা দায়েরের প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দেয়।

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

আপনার মন্তব্য লিখুন