স্বদেশের ধর্ষণ ঘটনায় ব্যথিত, লজ্জিত এবং নতজানু প্রবাসীরা

0

দুই বছর আগের কথা! কোরিয়ার ইনছনের সগু এলাকায় রাতে নিয়মিত ফুটবল খেলতাম, বলাচলে, ফুটবলপ্রেমী বাংলাদেশি ভাইদের যেন ঈদ আনন্দের মাঠ, সবাই হু হুল্লোড়, আড্ডা দিয়ে রাত কাটাতাম, বিশেষ করে রমজান মাসে। এক রমজানে প্রায় রাত দুইটার দিকে সবাই ফুটবল খেলা শেষ করে মাহবুব ভাইয়ের দোকানের দিকে ফিরছে,মাঠের অদূরে রাস্তা দেখতে ফেলাম চল্লিশ বছর বয়সী এক সুন্দরী নারী একা হেঁটে বাড়ি ফিরছে। আমরা কোরিয়াপ্রবাসীদের জন্য এই দৃশ্য নতুন কিছু নয়। প্রায়শই রাত-মধ্যরাতে শহর বা গ্রামে নারীদের একা চলাফেরা করতে দেখা যায়। কিন্তু আমাদের মধ্যে ইপিএসে নতুন আসা বাংলাদেশি প্রবাসী ভাই সুমন বিস্ময় চোখে দেখে প্রশ্ন, অবাধ মেলামেশার এই দেশে এটা কিভাবে সম্ভব? নারীদের এমন নিরাপদ চলাফেরার রহস্য কি? এই সত্য ঘটনার পেছনের গল্প হচ্ছে আইনের সঠিক প্রয়োগ, জনগণের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা। তা ছাড়া কোরিয়ানরা ভদ্র, বিনয়ী, লাজুক ও সভ্য জাতি।

যেজন্য এই ঘটনার অবতারণা করেছি, আমাদের প্রিয় স্বদেশ বাংলাদেশে ধর্ষণ সামাজিক ব্যাধিতে রূপ নিয়েছে। এ দেশে স্বামীকে বেধে, মারধর করে স্ত্রীকে ধর্ষণ করা হয়! মায়ের সামনে মেয়েকে! ভাইয়ের সামনে বোনকে!বাবার সামনে কন্যাকে ধর্ষণ করা হয়! সুদূর প্রবাসে বসে দেশের এই সব ঘটনা আমাদের পীড়িত করে। হই লজ্জিতও। ধর্ষণের ঘটনাগুলো মাঝে মাঝে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচার হয়, যেমনটি বছরখানেক আগে নোয়াখালীর বর্বর এক ধর্ষণ ঘটনা কোরিয়ার গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচার করা হয়। দুদিন পর কোম্পানির বস যখন এ নিয়ে প্রশ্ন করেছিল আমার কোন জবাব ছিলনা,পরের ক’দিন তার চোখে চোখে রেখে কথা বলতে পারেনি। আমার ধারণা তাবৎ বিশ্বে আমাদের মতাে লক্ষ-কোটি রেমিট্যান্সযোদ্ধা প্রবাসী বাংলাদেশিদের অনেকে এমন প্রশ্নের মুখে পড়েছেন, পড়ছেন এবং নতজানু হচ্ছেন।

ধর্ষণের খবর প্রচার হওয়ার পর সবাই সরব, শুরু হয় রাজনীতিক, সমাজবিদ, সুশীল আর বুদ্ধিজীবীদের বাকবিতান্ড, মত-অভিমত আর রাষ্ট্রযন্ত্রের তুলোধুনা। অন্যদিকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আপামরের ক্ষােভ-প্রতিবাদের ঝড়। কিন্তু কিছুদিন পরই সুনশান নিরবতা! যেমনটি এখন সিলেটের এমসি কলেজের প্রধান ফটকের সামনে স্বামীর সামনে এক তরুণীকে ধর্ষণের ঘটনায় দেশ তোলপাড়। স্বামীকে গাড়িতে আটকে রেখে তরুণীকে নামিয়ে ছাত্রাবাস ব্লকে নিয়ে দলবেধে ধর্ষণ, তাও আবার শিক্ষার্থীরা, আছে রাজনৈতিক লেবেলও। ভাবতে শিহরে ওঠি। কোন দেশের নাগরিক আমরা। আমরা ব্যথিত, লজ্জিত। আন্তর্জাতিক মিডিয়া যখন খবর হয়েছে, দুদিনের সাপ্তাহিক ছুটি শেষে কাল সোমবার বসের মুখোমুখি হবো কিভাবে, কপালে সেই চিন্তা রেখা আমরা।

বিচিত্র দেশ আমাদের। আইনে এদের মৃত্যুদণ্ড হয় না। মামলা চলতে থাকে বছরের পর বছর। মামলার ঘানি টানতে টানতে ন্যায়বিচার প্রত্যাশী হাপিয়ে উঠে। ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি ! আমরা জানি প্রতিটি দেশ, সমাজ, এমনকি প্রতিটি সমাজ ব্যবস্থায় ধর্ষণকে সব থেকে বড় এবং ঘৃণ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। একই সঙ্গে ধর্ষণের বিরুদ্ধে শাস্তির বিধানও সেভাবে নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু কিছু কিছু দেশে ধর্ষণের সাজা মারাত্মক না হওয়ায় ধর্ষণ এমন রূপ লাভ করে যে তা নিয়ে পুরো সমাজে অস্থির অবস্থার সৃষ্টি হয়। এই করোনা মহামারির মধ্যেও আমাদের দেশের অনেক এলাকায় এখনো ধর্ষণের মত ঘৃণ্য কাজ ঘটে চলেছে।

গুগল জগতে গিয়ে দেখলাম, আমরা কি করি, অন্য দেশ কি করে! আমরা দেখে নিতে পারি কিছু দেশ কীভাবে তাঁদের দেশে ধর্ষণকে কমিয়ে আনতে কেমন কোঠর শাস্তির বিধান রেখে আইন করেছে। অনেক দেশ আছে যেখানে তাঁরা মৃত্যুদণ্ড দেন না, তখন মৃত্যুদণ্ডের বদলে কী আইন করা হয়েছে তা এক নজর দেখে নেওয়া যায়।   

সমাজতন্ত্রে বিশ্বাসী চীনে ধর্ষণের সাজা শুধুমাত্র মৃত্যুদণ্ডই। ধর্ষণ প্রমাণ হলেই আর কোন সাজা নয়, সরাসরি মৃত্যুদণ্ড। আর তা কার্যকর করা হয় অত্যন্ত দ্রুত। ইরানে ধর্ষকের শাস্তি হয় ফাঁসি, না হয় গুলি। আফগানিস্তানে ধর্ষণের হার অত্যন্ত কম। তবে, সেখানে ধর্ষণ করে কেউ ধরা পড়লে সোজা মাথায় গুলি করে মারা হয়। সৌদি আরবে ধর্ষণের সাজা ভয়ঙ্কর। এখানে ধর্ষককে প্রকাশ্যেই পিটিয়ে মারা হয়। গ্রিসে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তার একমাত্র শাস্তি আগুনে পুড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড।

মুসলিম রাষ্ট্র ইন্দোনেশিয়ায় শিশু ধর্ষণের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। ইন্দোনেশিয়ায় শিশু ধর্ষণের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে দেশটির আইনে সংশোধন করেছে। তবে ২০১৬ সালের এক আইনে ইন্দোনেশিয়ায় যৌন নির্যাতনের দায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের রাসায়নিক উপাদান ব্যবহারের মাধ্যমে নপুংসক করা হবে বলে ডিক্রি জারি করা হয়।

ফ্রান্সে নির্যাতিতার শারীরিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে ধর্ষকের সাজা ঠিক করা হয়। তবে, ধরা পড়ার পর এবং অপরাধ প্রমাণিত হলে কমপক্ষে ১৫ বছরের কারাদণ্ড। অপরাধ গুরুতর হলে তা বেড়ে হতে পারে ৩০ বছরও। নেদারল্যান্ডসে যে কোনো ধরনের যৌন নিপীড়ন, এমনকি অনুমতি ছাড়া জোর করে চুম্বন করাও নেদারল্যান্ডসে ধর্ষণ হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে। এর শাস্তি হিসেবে অপরাধীকে বয়সের ওপর ভিত্তি করে ৪ থেকে ১৫ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড ভোগ করতে হয়।

সংযুক্ত আরব আমিরাতে যৌন নির্যাতন বা ধর্ষণের সাজা সরাসরি ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড। এক্ষেত্রে কোনো ক্ষমা নেই, ধর্ষণ করলেই অপরাধ প্রমাণের ৭ দিনের মধ্যে মৃত্যুদণ্ড পেতে হবে। মিশরে ধর্ষককে বরাবরই যে কোনো জনাকীর্ণ এলাকায় জনসম্মুখে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। উত্তর কোরিয়ায় ধর্ষণের সাজা শুধুই মৃত্যুদণ্ড। উত্তর কোরিয়া ধর্ষণের বিচার বা শাস্তির জন্য বিন্দুমাত্র কালক্ষেপণ করে না। সেখানে ধর্ষককে ফায়ারিং স্কোয়াডে নিয়ে মাথায় গুলি করে তাৎক্ষণিকভাবে ভিকটিমকে ন্যায়বিচার দেয়া হয়। ইউক্রেনে কেউ ধর্ষণ করলে সেই ধর্ষককে শাস্তি হিসেবে নপুংসক করে দেওয়া হবে। দোষীদের যৌন সক্ষমতা নষ্ট করে দেওয়ার আইন পাস করা হয়েছে ইউক্রেনের পার্লামেন্ট।

যুক্তরাষ্ট্রে দুই ধরনের আইন প্রচলিত – অঙ্গরাজ্য আইন এবং ফেডারেল আইন। ধর্ষণ মামলাটি ফেডারেল আইনের অধীনে পড়লে ধর্ষককে অর্থদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়ে থাকে। তবে অঙ্গরাজ্য আইনের অধীনে পড়লে সাজার প্রকৃতি নিশ্চিত নয়। কেননা দেশটির একেক অঙ্গরাজ্যে ধর্ষণের শাস্তি একেক রকম। যেমন আলাবামা অঙ্গরাজ্যে শিশু ধর্ষণ রুখতে নতুন এক আইন পাস করা হয়েছে। ওই আইনে, ১৩ বছরের কম বয়সী কোনো শিশুকে ধর্ষণ করলে ধর্ষকের শরীরে রাসায়নিক ইনজেকশন প্রবেশ করিয়ে নপুংসক করা হয়।

রাশিয়ায় ধর্ষণের শাস্তি কমপক্ষে ৩ বছরের কারাদণ্ড। ভিকটিমের ক্ষতি কতটা গুরুতর, তার ওপর নির্ভর করে ধর্ষকের সাজা বাড়িয়ে ৩০ বছর পর্যন্ত করা হতে পারে ধর্ষণ-ধর্ষণের শাস্তি। নরওয়েতে ধর্ষকের সাজা ধর্ষণের শিকার ব্যক্তির ক্ষতির পরিমাণের ওপর নির্ভর করে ৪ থেকে ১৫ বছরের কারাদণ্ড। ইসরায়েলে ধর্ষক ব্যক্তি ন্যূনতম ৪ থেকে সর্বোচ্চ ১৬ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ডে দণ্ডিত হয়ে থাকে। 

কয়েক মাস আগে লক্ষ্মীপুর সদরের ১৪ বছর বয়সী নবম শ্রেণির এক ছাত্রী হিরামনিকে ধর্ষণ করার পর শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। সন্দেহভাজন ধর্ষকদের আটক করেছে পুলিশ। কিন্তু দেশের বিদ্যমান আইনে তাঁদের বিচার নিয়ে জনমনে সংশয় আছে। এ কারণে গত জানুয়ারি ২০২০ এ অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ অধিবেশনে বাংলাদেশে শিশু, নারী, প্রতিবন্ধীদের ধর্ষণ বন্ধ করতে ধর্ষকদের ক্রসফায়ারে দেয়ার দাবি উঠেছিল সরকারী ও বিরোধী দলীয় এমপিরা।

বাংলাদেশে একসময় এসিড সন্ত্রাস ভয়াবহ রূপ নিয়েছিল। এসিড সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোর আইন করার পরে এই ধরণের অপরাধ উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে। তাই ধর্ষকদের শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা নপুংসক করার বিধান রেখে আইন পাশ করলে বাংলাদেশে ধর্ষণের ভয়াবহতা অনেক কমে যাবে বলে অপরাধ বিজ্ঞানীরা মনে করেন অথবা ধর্ষণের কঠোর শাস্তি রাষ্ট্র নিশ্চিত করে লাইভ দেখাতে পারে।

বর্তমানে,দেশে ধর্ষণের প্রকোপ বেড়েছে ব্যাপক মাত্রায়। প্রতিদিনই গণমাধ্যমগুলোতে ধর্ষণের খবর আমরা দেখছি বা শুনছি। ধর্ষণের পরও দৃষ্টান্ত রাখার মত শাস্তি পাচ্ছে না অবিবেচক, পাষণ্ড পুরুষ। একটি নারীদেহ একজন বা কয়েকজন মিলে জোরপূর্বক ভোগ করার পর সমস্ত চিহ্ন ঢেকে ফেলতে তারা তাকে হত্যা করছে, এবং পথেঘাটে আবর্জনার মতো ফেলে দিচ্ছে ভোগ করে নেওয়া সেই প্রাণহীন নিথর দেহ।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের রিপোর্ট বলছে, প্রতিবছর মারাত্নক আকারে ধর্ষণ বাড়ছে। ধর্ষণ শেষে বর্বর পুরুষ ১৬ জন নারীকে হত্যা করেছে এবং নারী নিজেকে লজ্জা থেকে বাঁচাতে ৫ জন নারী আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন। নারীদের নিরাপত্তা দেয়ার দায়িত্ব রাষ্ট্রের। জনৈক মনীষী বলেছেন,নারীরা পৃথিবীর অর্ধেক, বাকী অর্ধেককে তারা জন্ম দেন। আসুন আমরা নারীদের সম্মান করি,প্রাণখোলা সমাজ গড়ি।

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।