রেবেকা ডাইকস : মানবতার যে প্রদীপ নিভেছিল লেবাননে

0

বৃহস্পতিবার (২০ ফেব্র্রুয়ারি) লেবাননের সর্বোচ্চ আদালতের একজন বিচারক ব্রিটিশ দূতাবাসের কর্মকর্তা রেবেকা ডাইকসকে হত্যার অভিযোগে অভিযুক্ত ব্যক্তির মৃত্যুদণ্ডাদেশ স্থগিত করেছেন, রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা-এনএনএ এ খবর জানিয়েছে।

ডাইকসকে ধর্ষণ ও হত্যার অপরাধে গত বছরের ১ লা নভেম্বর লেবানিজ উবার চালক তারেক হুশিহকে দেওয়া মৃত্যুদণ্ডের রায়টি প্রত্যাহার করেন বিচারক জামাল আল হাজর। এমন সিদ্ধান্তের কোনও কারণ দেওয়া হয়নি। আদালতের পরবর্তী শুনানী বা অধিবেশন ২ মার্চ নির্ধারণ করেছেন বিচারক হাজর।

রেবেকা তার সহানুভূতিশীল মন দিয়ে জয় করেছিলেন সিরীয়া, ফিলিস্তানি আর প্যালেস্টাইনি হাজার হাজার শরনার্থীর হৃদয়। লেবানন মিশনে এসে মর্মান্তিকভাবেসংক্ষিপ্ত হয়েছিল তার জীবন। মাত্র ৩০ বছর বয়সে এক উবার চালকের লালসার শিকার হয়ে চির বিদায় নিতে হয় মানবতার এই ফেরিওয়ালা, ব্রিটিশ কূটনীতিককে।

যে ঘটনা শুধু লেবানন নয়, আলোড়িত করেছিল বিশ্বকে,কাঁদিয়েছিল হাজার মানুষকে, শোক নেমেছিল শরণার্থী শিবিরে।

২০১৭ সালের ১৬ ডিসেম্বর সন্ধ্যার আগে লেবাননের জেমমায়জ এলাকায় একটি বার থেকে বের হওয়ার পর নিখোঁজ হয়েছিলেন রেবেকা। পরে মেটনের একটি হাইওয়েতে তার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

পরে তদন্তে বেরিয়ে আসে উবার চালক তারেক হুশিহ তাকে ধর্ষণ ও হত্যা করে। পুলিশ ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার সিসিটিভিতে হুশিহের গাড়ি শনাক্ত হয়েছিল এবং হত্যার কয়েকদিন পর তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল।

রেবেকা ডাইকসকে হত্যার কথা স্বীকার করে আদালতে তারেক জবানবন্দী দিয়েছিল তারিক হুশিহ। ধর্ষণের পর দড়ি দিয়ে শ্বাসরোধ করে তারিক হত্যা করে রেবেকা ডাইকসকে।

 রেবেকার ধর্ষক ও হত্যাকারী উবার চালক তারেক হুশিহ বেশ কয়েকেবার নানা অপরাধে কারাগারে বন্দী ছিল
রেবেকার ধর্ষক ও হত্যাকারী উবার চালক তারেক হুশিহ বেশ কয়েকেবার নানা অপরাধে কারাগারে বন্দী ছিল

এর আগেও বেশ কয়েকেবার নানা অপরাধে লেবাননের কারাগারে বন্দী ছিল তারিক। কথিত আছে যে, লেবাননের নাগরিক তারিক নকল লাইসেন্স দিয়ে ট্যাক্সি ড্রাইভার হিসাবে কাজ করতেন। জাল নথি ছাড়াও মাদক সেবন এবং তার মালিককে লাঞ্ছিত করা অপরাধ লুকিয়ে তিনি তিনি উবার চালানোর সুযোগ নিয়েছিলেন।

সোশ্যাল মিডিয়ায় লন্ডনের বাসিন্দা হিসেবে অবস্থান জানান দিলেও বিশ্বাস করা হয় রেবেকা ওয়ার্সস্টারশায়ারের মালভার্ন সেন্ট জেমস বালিকা বোর্ডিং স্কুলে পড়ার আগে হংকংয়ে বড় হয়েছেন।

তিনি ২০০৫ সালে বৃটেনের ম্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটি থেকে সামাজিক নৃবিজ্ঞানের স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন এবং লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্কবেক থেকে আন্তর্জাতিক সুরক্ষা ও বৈশ্বিক প্রশাসনে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি পেয়েছিলেন।

তিনি ম্যালভার্ন গার্লস কলেজ ও রাগবি স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষার্থী। তিনি একটি চীনা আন্তর্জাতিক স্কুলে ইংরেজিও পড়িয়েছিলেন।

রেবেকা ডাইকসের অকাল ও মর্মন্তিক মৃত্যুতে সে সময় গভীর শােক নেমে এসেছিল বৈরুতের কূটনৈতিক পাড়াসহ লেবানন ও বৃটেনে। শুধু তাই শরানার্র্থদের জন্য কাজ করা একজন মানবতাপ্রেমী যুবতীর এমন মৃত্যুে আলোচনার ঝড় ওঠে বিশ্বব্যাপী।

সে সময় শোক জানাতে গিয়ে রেবেকা ডায়ইক্সকে একজন প্রতিভাবান, নিবেদিত মানবতাবাদী “যার দক্ষতা এবং আবেগ অনেকের জীবনকে উন্নত করেছে” হিসাবে বর্ণনা করে বৈরুতে ব্রিটিশ দূতাবাস। দূতাবাস বলেছিল,”মিজ ডাইকস সবার অনেক বেশি প্রিয় ছিলেন এবং আমরা তাঁকে গভীরভাবে মিস করবো”।

রেবেকার পরিবার বিবৃতিতে বলেছিল যে, সে “অপূরণীয়”।

রেবেকা ডাইকসের মৃত্যুর কিছু দিনের মধ্যেই তার পরিবার মানবিক সহায়তা করার জন্য ‘রেবেকা ডাইকস ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠা করেছিল। যার লক্ষ্য লেবাননের শরণার্থীদের জীবনযাত্রার উন্নয়নে তার কাজ চালিয়ে যাওয়া।

সিরিয়া ও ফিলিস্তিনি শরণার্থী সম্প্রদায়ের “আরও শান্তি” নিশ্চিতে অবদানের জন্য বৃটেনের ম্যানচেস্টার বিশ্ববিদ্যালয় মরণোত্তর ‘অসাধারণ প্রাক্তন শিক্ষার্থী’ পদকে ভুষিত করেছিলে রেবেকাকে।

রাজধানী বৈরুতের জাতীয় জাদুঘরের বাইরে কয়েক হাজার নারী  জড়ো হয়ে মোমবাতি জ্বালিয়ে স্মরণ করে রেবেকা ডাইকসকে
রাজধানী বৈরুতের জাতীয় জাদুঘরের বাইরে কয়েক হাজার নারী জড়ো হয়ে মোমবাতি জ্বালিয়ে স্মরণ করে রেবেকা ডাইকসকে

এই ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ড নিয়ে সোচ্চার হয়েছিল লেবাননের নারী সমাজ । ঘটনার পরের শনিবার (২০১৭ সালের ২৩ ডিসেম্বর) সন্ধ্যায় কয়েক হাজার নারী রাজধানী বৈরুতের জাতীয় জাদুঘরের বাইরে জড়ো হয়ে মোমবাতি জ্বালিয়ে স্মরণ করে রেবেকা এবং সেই সপ্তাহে লেবাননে খুন হওয়া আরও তিন আরব নারীকে। এর মধ্যে তিন লেবানিজ এবং একজন সিরীয় নারী ছিলেন।

অংশগ্রহণকারীরা চার নারীর ছবিতে সাদা গোলাপ ছড়িয়ে চারপাশে মোমবাতি জ্বালিয়ে দিয়েছিল। ভুক্তভোগীদের শোক জানাতে গিয়ে লেবাননের নারী অধিকার কর্মীরা, নারীর প্রতি সহিংসতা রুখতে আরও ভাল আইন কার্যকরের দাবি জানান।

তার বলেন “এই সহিংসতা কাঠামোগত এবং পদ্ধতিগত । আমাদের কথা শোনার বা রক্তপাত না হওয়া পর্যন্ত আমাদের দেখতে অস্বীকার করে এই সমাজ। ”

“আমাকে কাভার (ঢাকা) করতে বলো না। তাকে বলুন আমাকে ধর্ষণ না করতে”, একজন নারী মেগাফোনের মাধ্যমে চিৎকার করে বলার পর আবার বলার জন্য দাবি ওঠে ভিড় থেকে।

বৈরুত ভিত্তিক মহিলাদের অধিকার গোষ্ঠী অ্যাবাডের সেই সালের জাতীয় সমীক্ষায় ওঢঠে আসে যে, লেবাননে চার জনের মধ্যে একজনকে ধর্ষণ করা হয়েছে। সমীক্ষায় বলা হয়েছে যে যৌন নিপীড়নের মুখোমুখি এক চতুর্থাংশেরও কম মহিলারা এটি রিপোর্ট করেছেন।

“আস্তে আস্তে, আমরা নীরবতা ভেঙে দিচ্ছি … মহিলারা এগিয়ে আসুন এবং তারা যে সহিংসতার মুখোমুখি হচ্ছেন সে সম্পর্কে কথা বলার জন্য,”অ্যাবাডের প্রোগ্রাম ম্যানেজার সাজা মাইকেল বলেছিলেন।

লেবাবাননে মৃত্যদণ্ড কার্যকর আইনী তবে অনানুষ্ঠানিক স্থগিতাদেশ রয়েেছে, মানে গত ১৫ বছরে কোনওটিই কার্যকর করা হয়নি। দেশটি ২০০৪ সালে শেষবার দু’জন দণ্ডপ্রাপ্ত খুনির একজনকে ফায়ারিং স্কোয়াড গুলি করে এবং একজনকে ফাঁসি দিয়ে কার্যকর করা হয়।

২০০৪ সাল থেকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর না হলেও বিচারকরা এই সাজা প্রদান অব্যাহত রেখেছেন, যা সাধারণত কঠোর পরিশ্রম করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে অনুবাদিত হয়।

লেবাননের মানবাধিকার সংস্থা ওয়াচটাগড এএলএফ-এর একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় নেতাকর্মীরা সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড বিলুপ্ত করার আহ্বান জানালেও, এর স্বপক্ষে দেশটির জনগণ ও রাজনৈতিক সমর্থন অব্যাহত রয়েছে।

একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, ২০১৮ সালে দেশটির বিভিন্ন কারাগারে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত ৮২ জন বন্দী ছিল।

গত বছর প্রথম যখন আদালতের রায়ে ঘাতক তারিককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, সে সময় প্রতিক্রিয়ায় বৈরুতে বৃটিশ দূতাবাস বলেছিল যে, তারা আশা করছে আদালতের রায় ডাইকসের ঘনিষ্টজনদের শান্তি যোগাবে। তবে যুক্তরাজ্য সরকার “সকল পরিস্থিতিতে” মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা করে চলেছে।

ঘাতক তারিকের মৃত্যুদণ্ড রহিত করে দেওয়া বিচারক হাজরের নতুন আদেশের বিষয়ে রেবেকা ডাইকসের পরিবারের কিংবা প্রতিক্রিয়া এখনও পাওয়া যায়নি। যুক্তরাজ্যেও এ ব্যাপারে এখনও কোন প্রতিক্রিয়া জানায় নি। সহসা জানাবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

নতুন রায় মানে মৃত্যুদণ্ড রহিত আদেশের পর বৈরুত দূতাবাস বা বৃটিস সরকারের প্রতিক্রিয়া কি হতে পারে সে অপেক্ষা থাকতে হবে সবাইকে।

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

Loading...