রক্তের ঘামের প্রবাস নায়কদের উত্তরণের রোডম্যাপ চাই

0

আমি প্রায় দশ বছর ধরে প্রবাসে আছি, দীর্ঘ এই প্রবাস জীবনে বাংলাদেশের সূর্য সন্তান রেমিট্যান্স ফাইটারদের নিয়ে লিখেছি বিস্তর । ক্ষুদ এই জীবনে অর্থনীতির অন্যতম প্রধান নিয়ামক, প্রাণভোমরা রেমিট্যান্স নায়কদের নিয়ে অনেক লিখেছি। সে সব লিখায় রেমিট্যান্স নায়কদের পাঠানো অর্থ, তাদের সুখ দু:খের খবর, উন্নতি সফলতা রাষ্ট্রের পাশে দাঁড়ানোর গল্প, দেশের অর্থনীতির চাকাকে সচল রাখার গল্প চুলচেরা বিশ্লেষণও করার চেষ্টা করেছি।

আপনারা জানেন, নিবন্ধিত অনিবন্ধিত মিলে বিশ্বজুড়ে দুই কোটি বাংলাদেশি আছেন। কিন্তু বিশ্বে ১৩০ টির মতো দেশ আছে, যেখানে পুরো জনসংখ্যাই কোটির কম,শুধু কোটির কম নই, কিছু কিছু দেশ আছে যাদের পুরোদেশের জনসংখ্যা বিশ লাখের নিচে। বিপরীত দিকে ১৬০টি দেশে বাংলাদেশের এক কোটি ত্রিশ লাখ মানুষ প্রবাসে নিয়মিত আয় করছেন।

বৈশ্বিক হিসাবে বাংলাদেশ প্রথম পাঁচটি দেশের মধ্যেই। এ দেশের দুর্দমনীয়, অকল্পনীয়, প্রাণোচ্ছল, মেধাবী, পরিশ্রমী তরুণ তরুণীদের বড় এক অর্জন। কথা হচ্ছে, এই তারুণ্যকে রাষ্ট্র কী দিয়েছে? কী পলিসি নির্ধারণ, বা অন্য খাতকে শক্তিশালী করতে যে উদ্যোগ নেয়া হয়, এই খাতের জন্য কি সঠিকভাবে নেয়া হচ্ছে কিনা সেই হিসাব কষবার হয়েছে এবার। মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার প্রশ্ন এসেছে, করোনাকালে প্রবাসীদের জন্য বরাদ্ধ দেয়া প্রবাসী ব্যাংক থেকে একজন প্রবাসীও খণ পাইনি। কেন পেল না, কেউ কি উদ্যোক্তা হতে চাই না? নাকি কোন শুভঙ্করের ফাঁকি সে প্রশ্ন সামনে এসে যায়।

যে বিষয়ে বলছিলাম, করোনাকালে বলা চলে অনলাইনে বিশ্ব ভ্রমণ করেছি,করোনাময় বিশ্ব কেমন আছেন বাংলাদেশীরা এই শিরোনামে আকাশযাত্রার প্রধান সম্পাদক এজাজ মাহমুদের উৎসাহে, অনুপ্রেরণায় নিয়মিত প্রবাসী রেমিট্যান্সযোদ্ধা, সংবাদযোদ্ধা ও শিক্ষার্থীদের সুখদু;খ তুলে আনার চেষ্টা করেছি লাইভ টকশোর আয়োজন করে, একই সাথে মূলধারার জাতীয় গণমাধ্যম সমূহে করোনাকালে তাদের আদোপ্যান্ত নিয়ে লিখেছি। শুধু অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থেমে থাকেনি, যখনই প্রবাসীদের কোনও তথ্য পেয়েছি, সঙ্গে সঙ্গে রিপোর্ট করেছি, নিজেকে কষ্ট দিয়ে।

লিখতে গিয়ে চোখে ভেসে উঠেছে মুক্তিযোদ্ধাদের কথা, যারা দেশটা রক্তের বিনিময়ে স্বাধীন করেছে, ভেসে উঠেছে জাতির জনকের কথা, যিনি ৫৬ হাজার বর্গমাইল স্বাধীন করে দিয়েছেন নতুন প্রজন্মের জন্য, স্বাধীন করা দেশটিকে কারা বটগাছের মত ছায়া দিয়ে যাচ্ছেন তাদের নিস্পাপ, নির্ভার, নির্ভেজাল এক একটি মায়াবী মুখ নিয়ে ভেবেছি; যাদের কষ্টার্জিত অর্থে কিভাবে এই করোনাকালেও ফুলেফেপে ভরে উঠেছে আমাদের বিদেশি মুদ্রার উঠান। আর সেই উঠানের অর্থ দিয়ে পণ্য আমদানি করে ষোল কোটি মানুষ খাচ্ছে, দেশের উন্নয়ন হচ্ছে,গ্রামীণ অর্থনীতি দাঁড়িয়েছে। কোটি কোটি টাকার গাড়িতে চড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে,মন্ত্রী, এমপি,সচিব,ভিসি,রাষ্ট্রদূত বা অন্য কোন কর্মকর্তা, যাদের অবদানে বাসায় অফিসে ঘুরছে ফ্যান বা এয়ার কন্ডিশন।

তাদের অবদানে কত বিলাসী জীবনযাপন করছি, তাদের কথা কি প্রকৃতপক্ষে ভাবছি? কি কষ্টটাই না করে তারা এই টাকাটা দেশে পাঠান? কি কষ্ট না তারা করেন, তাদের কষ্ট, তাদের বেদনা, তাদের দু:সহ যন্ত্রণা, লিখতে কষ্ট লাগে। কিছুদিন আগে ফেসবুকে একটি রাশেদ নামের এক কিশোর সৌদিপ্রবাসীর ভিডিও দেখেছিলাম, সে খেয়ে না খেয়ে তার সব টাকা পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছে, একইসঙ্গে তার কথায় চোখে, মুখে ফুটে উঠেছে,পরিবারের প্রতি,দেশের প্রতি টান-ভালোবাসা-মমত্ববোধ, প্রাণঢালা আন্তরিকতা।

তাদের এই প্রতিদান শোধ কেউ কি করেছে, রিজার্ভ-রেমিটেন্স বেশি বেশি হয়, এই নিয়ে অনেক দায়িত্বশীল ব্যক্তি খুশি,কিন্তু এই প্রবাসীদের জন্য, যারা কাজ হারিয়েছে, অর্থসংকটে পড়েছে,যারা দেশে আটকা পড়েছে,বা যে সব প্রবাদী বেকার তাদের জন্য রাষ্ট্র কি করেছি,আমরা কি করেছি। রেমিট্যান্স গেলে তৃপ্তি লাগে,শান্তি লাগে, ভালো লাগে প্রকান্তরে,তাদের জন্য করতে কি কষ্ট লাগে।

করোনা মহামারীতে রেমিট্যান্স নাবিকরা ভালো নেই। তাদের কষ্ট আরও বেড়ে গেছে। একদিকে প্রাণঘাতী এই ভাইরাস থেকে নিজেকে মুক্ত রাখা, কাজ ফিরে পাওয়ার শঙ্কা, দেশ থেকে আসার আশা নানা উদ্বিগ্নতা দিন কাটাচ্ছেন তারা। সবকিছুর পরও থেমে নেই তাদের আসল কাজ। দেশে পাঠিয়েই চলেছেন অর্থ। করোনাভাইরাস সংকটে রপ্তানি আয় তলানিতে নেমে আসলেও প্রবাসীদের পাঠানো রেমিটেন্স আশার আলো শুধু জাগায়নি বাংলাদেশের অর্থনীতিকে মজবুত ও টেকসই করেছে।

গণমাধ্যমের সূত্র মতে, করোনার আগে গড়ে দুই হাজার বাংলাদেশি বিদেশে যেতেন কাজের জন্য। কিন্তু এখন সে ঢেউ নেই। যারা জীবনের সঙ্গে যুদ্ধ করে এখনো বিদেশে টিকে আছেন, যাঁরা ফিরতে বাধ্য হয়েছেন, সকলে সরকারের প্রাণখোলা সহযোগিতা প্রত্যাশা করছেন। আসুন আমরা এই যোদ্ধাদের অবদানকে শুধু মুখে স্বীকার নই বাস্তবে স্বীকৃতি দিই।এদের জন্য নির্ভেজাল, সরল সোজা নীতি করি।

রবীন্দ্রনাথের কবিতার ভাষায় বলছি,ঘুমায়ো না আর কেহ রে। হৃদয়পিণ্ড ছিন্ন করিয়া ভাণ্ড ভরিয়া দেহো রে। ওরে দীনপ্রাণ, কী মোহের লাগি রেখেছিস মিছে স্নেহ রে॥

লেখক : সাংবাদিক,আন্তর্জাতিক সম্পাদক-আকাশযাত্রা

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।