বাংলাদেশি কর্মীদের সঙ্গে প্রতারণা : কুয়েতি কোম্পানির বিরুদ্ধে দূতাবাসের কঠোর ব্যবস্থা

মধ্যপ্রাচ্যের দেশে প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকদের প্রতি প্রতারণা, শোষণ ও শ্রম আইন লঙ্ঘনের অভিযোগ নতুন নয়। তবে এবার ভিন্ন চিত্র। কুয়েতে একটি স্বনামধন্য কোম্পানি বিরুদ্ধে বাংলাদেশি কর্মীর এমন অভিযোগে আনার পর সরাসরি মাঠে নেমেছে বাংলাদেশ দূতাবাস — অভিযোগ ওঠা কোম্পানির বিরুদ্ধে চাহিদাপত্রের সত্যায়ন বন্ধ করাসহ শ্রমিকদের স্বার্থে নেওয়া হয়েছে কঠোর পদক্ষেপ।

বাংলাদেশ দূতাবাসের মিনিস্টার (শ্রম) মোহাম্মদ আবুল হোসেন স্বাক্ষরিত জনসচেতনতামূলক বিজ্ঞপ্তিতে এ বিষয়ে তুলে ধরা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কুয়েতের অন্যতম একটি কোম্পানি ওয়েল আল নসিফ এবং এর মালিকানাধীন ফজর আল খালিজ কোম্পানির বিরুদ্ধে বাংলাদেশি শ্রমিকদের সঙ্গে চুক্তিভঙ্গ, অবৈধ অর্থ আদায় এবং হঠাৎ করে কর্মী ছাঁটাইয়ের অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ দূতাবাসে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগী শ্রমিকরা। এ নিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশির মধ্যে চরম অসন্তোষ দেখা দেয়।

ভুক্তভোগীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের নভেম্বর থেকে এই কোম্পানির মাধ্যমে আল জাহারা হাসপাতালে ক্লিনার পদে শত শত বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগ করা হয় তিন বছরের চুক্তিতে। কিন্তু এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে চুক্তির মেয়াদ শেষ দেখিয়ে তাদের কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে নতুন হাসপাতালের চুক্তিতে স্থানান্তরের জন্য প্রতিজন শ্রমিকের কাছ থেকে আদায় করা হয় ৩৬০ কুয়েতি দিনার। অথচ কুয়েতের শ্রম আইন অনুযায়ী এই ব্যয় কোম্পানিকেই বহন করার কথা।

Travelion – Mobile

এরপর ৮৩০ জন বাংলাদেশি কর্মীকে ছাঁটাই করা হয় এবং আবার বাংলাদেশ থেকে নতুন শ্রমিক আনার প্রক্রিয়া শুরু করে কোম্পানি। এছাড়া, প্রায় ১৫০ জন কর্মীর ইকামা বাতিল করে তাদের দেশে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন বাংলাদেশি কর্মীরা।

এ নিয়ে প্রবাসী বাংলাদেশির মধ্যে চরম অসন্তোষ দেখা দিলে বাংলাদেশ দূতাবাস বিষয়টি দ্রুত কুয়েত সরকার এবং বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ে জানায়। প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো (বিএমইটি)’কে নির্দেশ দেওয়া হয়, সমস্যার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ওয়েল আল নসিফ কোম্পানির অনুকূলে আর কোনো কর্মীকে বাংলাদেশ থেকে ছাড়পত্র না দেওয়া হয়।

কুয়েতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল সৈয়দ তারেক হোসেনের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন বাংলাদেশ প্রেসক্লাব কুয়েতের সভাপতি ও কুয়েত প্রবাসের সিনিয়র সাংবাদিক মঈন উদ্দিন সরকার সুমন। ছবি সংগৃহীত
কুয়েতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল সৈয়দ তারেক হোসেনের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলেন বাংলাদেশ প্রেসক্লাব কুয়েতের সভাপতি ও কুয়েত প্রবাসের সিনিয়র সাংবাদিক মঈন উদ্দিন সরকার সুমন। ছবি সংগৃহীত

এরপর,বাংলাদেশ দূতাবাস ওয়েল আল নসিফ কোম্পানির প্রতিনিধিদের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করে অভিযোগগুলো তুলে ধরে এবং সমাধানে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপের অনুরোধ জানায়। কিন্তু কোম্পানির পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করা হয় এবং কোনো সমাধানের লক্ষণ পাওয়া যায়নি।

Diamond-Cement-mobile

বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে—পরিস্থিতি বিবেচনায়, বর্তমানে ওয়েল আল নসিফ কোম্পানির চাহিদাপত্র আর সত্যায়ন করছে না দূতাবাস। সে সঙ্গে শ্রমিকদের স্বার্থে এই কোম্পানির সঙ্গে ভিসা ও নিয়োগ সংক্রান্ত কোনো কার্যক্রমে জড়াতে সতর্ক করা হয়েছে।

বিষয়টি নিয়ে কুয়েতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মেজর জেনারেল সৈয়দ তারেক হোসেন–এর সঙ্গে কথা বলেন বাংলাদেশ প্রেসক্লাব কুয়েতের সভাপতি ও কুয়েত প্রবাসের সিনিয়র সাংবাদিক মঈন উদ্দিন সরকার সুমন। এ সময় রাষ্ট্রদূত বলেন, “প্রবাসী বাংলাদেশি শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় বাংলাদেশ দূতাবাস সব সময় সক্রিয় এবং যেকোনো প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিতে আমরা প্রস্তুত।”

তিনি আরও জানান, নতুন ভিসা নিয়ে কুয়েতে আসতে আগ্রহী শ্রমিকদের উচিত ভিসাটি বাংলাদেশ দূতাবাস কর্তৃক সত্যায়িত কিনা, তা ভালোভাবে যাচাই করে আসা। কারণ কুয়েতের যেসব কোম্পানি বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নিতে চায়, তাদের ভিসা সত্যায়নের আগে দূতাবাস নিশ্চিত করে—শ্রমিকের ন্যূনতম বেতন কত হবে,বাসস্থানের ব্যবস্থা আছে কিনা,প্রতিদিন ৮ ঘণ্টা কাজ, সপ্তাহে একদিন ছুটি, বছরে ১ মাসের বেতনসহ ছুটি থাকবে কি না—এই বিষয়গুলো। প্রবাসীদের অধিকার ও কল্যাণ নিশ্চিত করতে এসব শর্ত এখন বাধ্যতামূলকভাবে যাচাই করছে দূতাবাস।

এই উদ্যোগকে অভূতপূর্ব ও সাহসী পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন কুয়েতে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিরা। বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক সংগঠনের নেতারা এই উদ্যোগের প্রশংসা করেছেন। তাদের ভাষ্য, “এটাই হওয়া উচিত ছিল অনেক আগেই। এখন অন্তত কোম্পানিগুলো বুঝবে যে, বাংলাদেশি শ্রমিকরা আর একা নয়- পাশে তাদের সরকার ও দূতাবাস আছে। ”

সব খবর জানতে, এখানে ক্লিক করে আকাশযাত্রার ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে যুক্ত থাকার অনুরোধ

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!