ফ্লাইট বন্ধে অনিশ্চয়তা, উৎকন্ঠায় প্রবাসীরা

0

কাতারপ্রবাসী বাংলাদেশি কর্মী ঢাকার নবাবগন্জ থানার জগদীশ হাওলাদার ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে ৬ মাসের ছুটিতে দেশে এসে দেড় বছরেও ফিরতে পারেনি কর্মস্থলে । করোনার মেয়াদ নিষেধাজ্ঞায় আটকে আছেন বছর ধর । শেষ হয়ে গিয়েছিল আকামারও মেয়াদ। অনেক কষ্ঠে আকামা নবায়ন ও এন্ট্রি পারমিট ভাগ্য জুটলেও ফিরতে পারছেন না সময়মতো। ১৬ এপ্রিল ইউএস বাংলায় ফেরার কথা ছিল । ধার দেনা করে দেড় লাখ টাকায় টিকিট, কোয়ারেন্টিন হোটেলসহ আনুষাঙ্গিক সব ব্যবস্থা করেন। এখন সব ভেস্তে গেছে। হারাতেও হচ্ছে এন্ট্রি পারমিট।

কষ্ঠ আর আক্ষেপ নিয়ে বলেন, “ছুটি শেষে গত বছরের মার্চেই টিকিট কেটেছিলাম ফিরতে। তখন প্রথমবারের মতো দেওয়া চলাচল নিষেধাজ্ঞায় পড়ে ফ্লাইটে চড়তে পারি নি, এবারও একই দশা। গত একবছর ধরে ধার দেনা করেই ৮ জনের পরিবারের খরচ চালিয়েছে। নতুন যাত্রার খরচ যোগাতে গিয়ে অনেক খষ্ঠ হয়েছে। ফিরতে পারলে আবার সাবলম্বী হতে পারতাম। না পারার খবরে পরিবারের সবাই ভেঙ্গে পড়েছে। বুঝতে পারছিনা সামনে কি হবে, না যেতে পাররে ভিক্ষা করা ছাড়া উপায় থাকবে না”।
জগদীশ হাওলাদারের মতো কাতার থেকে করোনার আগে ছুটিতে এসে দেশে আটকে আছেন প্রায় ২ হাজার প্রবাসী । বিভিন্ন মাধ্যমে রিএন্ট্রি পারমিট সংগ্রহ করে ফেরার পথ বের করেছিলেন। সবমিলিয়ে দেড় থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত গুনতে হয়েছে এসব হতভাগ্য প্রবাসীকে। এর বাইরে করোনা পরিস্থিতির উন্নতির পরও দেশে আসা অনেকে কাতারপ্রবাসী একই ভোগান্তিতে পড়েছেন।

করোনা রোধে ২০ এপ্রিল পর্যন্ত সব আন্তর্জাতিক রুটে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ করে দেওয়ায় আবারও অনিশ্চয়তার যাতাকলে পড়েছেন হাজার হাজার প্রবাসী বাংলাদেশি । সময়মতো ফিরতে না পারলে ভিসা-চাকরি হারানো, আকামার (ওয়ার্ক পারমিট) মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ার আতংকের সঙ্গে বিমান টিকিটসহ যাত্রার আনুষাঙ্গিক সব ব্যবস্থার খরচ গচ্চার দুশ্চিন্তাও পড়েছেন। বিমানসংস্থা, ট্রাভেল এজেন্ট, স্পন্সর বা নিয়োগকর্তার সঙ্গে নানা মাধ্যমে যোগাযোগের চেষ্টা করে ‘কিভাবে ফিরবেন, আদৌ ফিরতে পারবেন কিনা’ এর উত্তর খুঁজে ফিরছেন ভুক্তভোগীরা। এর মধ্যে আছেন দীর্ঘ নিষেধাজ্ঞার পর কর্মস্থলে ফেরার নতুন জীবন পাওয়া অনেক প্রবাসী। তেমনি ঈদকে সামনে রেখে অনেকে দেশে ফেরার প্রস্তুতিও নিয়েছিলেন ।

তাই ফ্লাইট বন্ধের সিদ্ধান্তে অনিশ্চয়তা, উৎকন্ঠার সঙ্গে ক্ষোভও বাড়ছে তাদের। ‘হঠকারী’, ‘প্রবাসী স্বার্থ বিরোধী’ সিদ্ধান্ত বলে আখ্যা দিয়ে দ্রুত প্রত্যাহারের জানিয়েছেন ভুক্তভোগীদের সঙ্গে প্রবাসী সংগঠন এবং সেবা সংস্থাগুলো।

বাংলাদেশি শ্রম বাজারের সবচেয়ে বড় ক্ষেত্র এবং রেমিট্যান্স প্রবাহের প্রধান উৎস হচ্ছে উপসাগরীয় সহযোগিতা পরিষদ-জিসিসিভুুক্ত দেশগুলো। কুয়েত, বাহরাইন ছাড়া বাকি ৪ দেশে নিষেধাজ্ঞা শিথিল, ভিসা নবায়ন, এন্ট্রি পারমিট এবং ভিজিট ভিসার সুবিধায় সাম্প্রতিক মাসগুলোতে বাংলাদেশিদের ফেরা অনেকগুন বেড়েছিল । ফ্লাইট বন্ধের কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি পড়েছে এসব দেশের প্রবাসী বাংলাদেশিরা।

‘কঠোর লকডাউনে যান চলাচল বন্ধ থাকবে বলে যাত্রীদের বিমানবন্দরে পৌঁছাতে সমস্যা হবে, হয়তো নির্ধারিত ফ্লাইট ধরতে পারবে না- এমন অজুহাতে বেবিচকের ফ্লাইট চলাচল বন্ধ হাস্যকর, মেনে নেওয়া যায় না মন্তব্য করে কাতার সরকার নিবন্ধিত বাংলাদেশ কমিউনিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক নুর মোহাম্মদ বলেন, ‘কাতারসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বিমানযাত্রীরদের জরুরী সেবার হিসেবে লকডাউনের বাইরে রাখা হয়েছে। তারা পাসপোর্ট-টিকিট দেখিয়ে যানবাহনে করে বিমানবন্দর যাতায়াত করতে পারছেন। বাংলাদেশে সর্বাত্মক হরতালের যুগে বিশেষ ব্যবস্থা বিমানবন্দর গিয়ে ফ্লাইট ধরার অভিজ্ঞতা প্রবাসীদের আছে। প্রবাসীদের বিপাকে ফেলার মতো এমন হঠকারী সিদ্ধান্ত আমরা মেনে নিতে পারছিনা।”

দুই মাসের ছুটি শেষে ১৮ এপ্রিলে আবুধাবিতে কর্মস্থলে ফেরার কথা ছিল কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম উপজেলার গুনবতীর মো. ইয়াসিন। নির্ধারিত সময় ফিরতে না পারলে কোম্পানির চাকরি শর্ত অনুযায়ী তাকে নিজ খরচেই ফিরতে হবে। দুমাসের বেতনের টাকাও জরিমানা গুনতে হবে । তার মতো এমন অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতিতে পড়ছেন এ সময়ের সবচেয়ে সম্ভাবনার দেশ সংযুক্ত আরব আমিরাতের শত শত বাংলাদেশি।

আমিরাত থেকে জানা যায়, অনেক আগেই দেশটিতে করোনার প্রবেশ নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে। এ ছাড়াও প্রবাসী পরিবার, পর্যটক, ব্যবসীয়দের জন্য ভিজিট ভিসাও উন্মুক্ত করে। ভিজিট ভিসায় গিয়ে বৈধভাবে স্থায়ী হওয়ার লোভনীয় সুযোগও তারা দিয়েছে। ফলে গত ৬/৭ মাসে ধরে শত শত বাংলাদেশি দেশটিতে ঢুকছেন। ছুটি ও জরুরী প্রয়োজনেও ফিরছেন অনেকে। সেই চাপ সামালাতে এই রুটে আমিরাতি ও বাংলাদেশি ৫ টি বিমানসংস্থা প্রতিদিন একাধিক ফ্লাইট চালাচ্ছ। হঠাৎ করে নিষেধাজ্ঞায় সবাই উদ্বিগ্নের সঙ্গে ক্ষোভে ফুঁসছেন প্রবাসীরা।

আমিরাতে বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের যুগ্ম সাথারণ সম্পাদক কামরুল হাসান জনির মতে, আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বন্ধ করা একেবারেই অবিবেচনাসূচক সিদ্ধান্ত হয়েছে। তিনি বলেন, “এর আগে নিষেধাজ্ঞা জারি করা ইউরোপসহ ১২ টি দেশের তালিকায় আমিরাত ছিল না। এখানকার করোনা পরিস্থিতি অনেকটা নিয়ন্ত্রণে। তার উপর বাংলাদেশি ফেরা ও প্রবেশের ঢল নেমেছে। হুট করে এমন সিদ্ধা ন্ত নেওয়ার আগে যথেষ্ট ভাবার অবকাশ ছিল। গত দুদিন ধরে দেশ-প্রবাসের বাংলাদেশিদের আকুতিতে আমরাও বিচলিত, উদ্বিগ্ন”।

পেটের টিউমার সারাতে গত নভেম্বরে দেশে ফিরেছিলেন ওমানপ্রবাসী বাংলাদেশি কর্মী মোহাম্মদ হাসান। আগামী ২২ এপ্রিল শেষ হয়ে যাবে তার ভিসার মেয়াদ, দুমাস পর পাসপোর্ট। তাই অস্ত্রাপ্রচারের পর কিছুটা সুস্থ হয়ে শুক্রবার রাতে বাংলাদেশ বিমানে চট্টগ্রাম থেকে ওমানে ফেরার প্রস্তুতি নেন। টিকিট, কোয়ারেন্টিন হোটেল, পিসিআর পরীক্ষা, বিমাসহ সব ব্যবস্থা করে দেয় ওমানি কোম্পানি । কিন্তু ফ্লাইট নিষেধাজ্ঞায় ফিরতে না পারায় এই বাংলাদেশি টেকনিশিয়ান এখন দিশেহারা।
“হয়তবা আমার আর প্রবাসী জীবনে যাওয়া হবে না। করোনাকালে কঠোর বিধি-নিষেধে ভিসা লাগানো শুধু কঠিনই হবে না খরচও যাবে বেশি। সে সঙ্গে বিমান টিকিটিসহ ভ্রমণের আনুষাঙ্গিক খরচ আমাকেই দিতে হবে। কারণ কোম্পানি দ্বিতীয়বার দায়িত্ব নিবে না। চিকিৎসায় অনেক খরচ হয়েছে, আমি একেবারে নিঃস্ব এখন,” বলেন চট্টগ্রামে মিরেরসরাইয়ের বাসিন্দা মোহাম্মদ হাসান।

আমিরাতের মতো ওমানেও প্রবাসী প্রবেশ স্বাভাবিক রয়েছে। দেশে আটকে থাকা প্রবাসীরা যেমন কর্মস্থলে ফিরছিলেন, তেমনি পরিবারের সঙ্গে ঈদ করতে দেশে আসার প্রবণতাও বেড়েছে। তার চেয়েও বড় বিষয় বিশেষ ক্ষমায় অবৈধ প্রবাসীরাও দীর্ঘদির পর দেশে ফেরার সুযোগ পেয়েছেন। দেশটিতেও লকডাউন থাকলেও ফ্লাইট চলাচল খোলা রাখা হয়েছে, যাত্রীদের রাখা হয়েছে লকডাউনমুক্ত।

এনআরবি-সিআইপি এসোসিয়েশেনর সাংগঠনিক সম্পাদক ওমানপ্রবাসী বাংলাদেশি শিল্পোদ্যোক্তা মোহাম্মদ ইয়াছিন চৌধুরী বলেন, বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান খাত গার্মেন্টস যদি খোলা রাখা যায়, রেমিট্যান্সের উৎস প্রবাসীদের জন্য কেন এমন প্রতিবন্ধকতা, তা আমাদের বোধগম্য নয়। অথচ এই করোনাকালে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের হতাশায় প্রবাসীরাই সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স পাঠিয়ে দেশের অর্থনীতিকে মহামারি পরিস্থিতিতেও সচল রেখেছেন। এমন ‘নির্মম উপহার’ আশা করি নি। এখন ফ্লাইট জটিলতায় যে সব কর্মী চাকরি বা ভিসা হারাবেন, হোটেল-টিকিট-বিমায় ক্ষতিপুরণ গুনবেন, তার দায় কে নিবে। আমরা মনে করি এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী হস্থক্ষেপ প্রয়োজন আছে। আমাদের দাবি দেশের স্বার্থে ফ্লাইট চলাচলে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হোক”।

বিমানসংস্থা ও ট্রাভেল এজেন্সিগুলো সূত্রে জানা গেছে, ভিসা-আকামা-চাকরি বাঁচাতে অনেক প্রবাসী দুই/তিন গুন বেশী বাড়তি খরচে তারিখ পরিবর্তন বা আগাম টিকেট নিয়ে গত দু’দিনে দেশ ছেড়েছেন । যার মধ্যে নতুন ভিসা ও ফ্যামিলি ভিসার প্রবাসীরা রাজধানীর জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) সদর দপ্তর এবং চট্টগ্রামের জেলা অফিসে প্রয়ােজনীয় ছাড়পত্র ও অনাপত্তি সনদ নিতে হাজির হয়েছিলেন। ব্যুরো সূত্র জানা গেছে, সোমবার সদর দপ্তরে ১৯৭৬ জন এবং চট্টগ্রাম অফিসে ২০০ জন ছাড়পত্র ও অনাপত্তি সনদ সংগ্রহ করেন, যা করোকালের স্বাভাবিক দিন থেকে ৩ গুণ বেশি।

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

আপনার মন্তব্য লিখুন