প্রবাসী নারী কর্মী : ফিরছে কেউ নিঃস্ব হয়ে, কারো লাশ

0

করোনাভাইরাস মহামারির মধ্যেও বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ রেকর্ড তিন হাজার ৯০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। এই সময় প্রবাসী নারী কমীরাই বেশি হারে টাকা পাঠিয়েছেন। তাঁরা পাঠিয়েছেন ৬৯ শতাংশ, পুরুষ ৩০ শতাংশ। বিদেশ যেতে যে পরিমাণ টাকা খরচ হয়, তা গড়ে পাঁচ মাসের মধ্যে প্রবাসী নারী কর্মীরা তুলে আনতে পারেন। রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) এমন তথ্যের বিপরীত চিত্র অনেক বেদনার। শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনসহ প্রতারণার শিকার হয়ে অনেক নারীই দেশে ফিরে আসেন বা আসছেন। এমনকি প্রাণ হারাচ্ছেন অনেকে। বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে এক কোটি ২০ লাখ বাংলাদেশি কর্মীর মধ্যে প্রায় ১০ লাখ নারী।

করোনা মহামারির বছরে ২০২০ সালে বিদেশ থেকে ফেরত এসেছেন মোট চার লাখ ২৫ হাজার ৬৯৭ জন কর্মী। এর মধ্যে ৫০ হাজার ৬১৯ জন নারী। আর তাঁদের ২২ হাজারই সৌদিফেরত। গণমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১৬ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত চার বছরে সৌদি আরব থেকে ১৩ হাজারের বেশি নারী দেশে ফিরে আসেন।

দৈনিক কালের কন্ঠে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে গত পাঁচ বছরে ৪৮৭ জন বাংলাদেশি নারী কর্মীর মরদেহ দেশে এসেছে। এর মধ্যে স্ট্রোকে ১৬৭ জন, আত্মহত্যায় ৮৬ জন, দুর্ঘটনায় ৭১ জন প্রাণ হারান এবং ১১৫ জনের স্বাভাবিক মৃত্যু হয়েছে। বেশির ভাগ মৃত্যুর ঘটনাই ঘটেছে সৌদি আরবে।

অধিক বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে নিয়ে গিয়ে কম বেতন দেওয়া, ঠিকমতো বেতন না দেওয়া, মানসিক নির্যাতন, জোরপূর্বক যৌনকাজে নিযুক্ত করা, গৃহকর্তার মাধ্যমে ধর্ষণের শিকার হওয়া, অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়া, শারীরিক-মানসিক নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার চেষ্টা করা, স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে না দেওয়া, পর্যাপ্ত খাবার ও বিশ্রামের সুযোগ না দেওয়া, ওয়ার্ক পারমিট আটকে রাখা, দীর্ঘ সময় কাজ করতে বাধ্য করা, দেশে স্বজনদের সাথে যোগাযোগ করতে না দেয়াসহ ইত্যাদি নানা ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হয়ে প্রাণ বাঁচাতে কর্মস্থল থেকে পালিয়ে পুলিশের হাতে ধরা দিয়ে দেশে ফিরে আসছেন বেশিরভাগ নারী কর্মী।

সৌদিতে নির্যাতন : বাংলাদেশি গৃহকর্মী তানিয়ার পা ভেঙে দেয়া হয়। ঘাড়ে-পিঠে ছ্যাঁকা দেয়া অন্য এক নারী কর্মী। ছবি: ব্র্যাক
সৌদিতে নির্যাতন : বাংলাদেশি গৃহকর্মী তানিয়ার পা ভেঙে দেয়া হয়। ঘাড়ে-পিঠে ছ্যাঁকা দেয়া অন্য এক নারী কর্মী। ছবি: ব্র্যাক

ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনসহ প্রতারণার শিকার হয়ে শূন্য হাতে দেশে ফেরত আসতে বাধ্য হচ্ছেন অনেক নারী। নির্যাতনের মাত্রা এত বেশি যে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে দেশে ফিরছেন অনেকে। আবার বিদেশে অনেকে মারাও যাচ্ছেন। হত্যার শিকার হওয়ার ঘটনাও ঘটছে। নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যার পথও বেছে নিচ্ছেন কেউ কেউ।

২০১৯ সালে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, ৩৫ শতাংশ নারী শারীরিক ও যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফিরে এসেছেন এবং ৪৪ শতাংশ নারীকে নিয়মিত বেতন দেওয়া হতো না। প্রতিবেদনে নারী কমীদের দেশে ফিরে আসার আসার ১১টি কারণ চিহ্নিত করা হয়।

প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক নাফরিজা শায়মা বলেন, ‘ফেরত আসা কর্মীদের অভিযোগের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট জায়গায় আর কর্মী দিচ্ছিে বাংলাদেশ। যেসব দেশে নির্যাতনের ঘটনা বেশি হচ্ছে সেসব দেশের পুলিশের সঙ্গে আমরা প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রাখছি। মামলা হচ্ছে, জরিমানা আদায় হচ্ছে। জরিমানা যা আদায় হচ্ছে, কর্মীর হাতে তুলে দিচ্ছি।’

নারী কর্মীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে অন্য পেশায় পাঠানো গেলে নিপীড়নের ঘটনা অনেক কমে যাবে মন্তব্য করে ব্র্যাকের অভিবাসন কর্মসূচির প্রধান শরিফুল হাসানের মতে, ‘গৃহকর্মীর পেশার পরিবর্তে যদি কেয়ার গিভার, গার্মেন্ট বা অন্য পেশায় পাঠানো যায় তাহলে ভালো হবে। আর গৃহকর্মী হিসেবে গেলে তাঁদের মোবাইল ফোন নিশ্চিত করতে হবে। আর এই উদ্যোগ সরকারকেই নিতে হবে।’

সৌদি আদালতে বাংলাদেশি গৃহকর্মী আবিরন হত্যা
সৌদি আদালতে বাংলাদেশি গৃহকর্মী আবিরন হত্যা

গত সপ্তাহে প্রবাসে নির্যাতনের শিকার শ্রমিকের জন্য ‘প্রবাস বন্ধু কল সেন্টার’ ই-সেবা চালু করেছে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। এর মাধ্যমে অনলাইনে ভয়েজ মেসেজ, ছবি, ভিডিও, এসএমএস সব মাধ্যমে অভিযোগ দায়ের করতে পারবে নারীরা সকল প্রবাসী কর্মীরা।

উন্নত ভবিষ্যতের আশায়, বিদেশে পাড়ি জমিয়ে শারীরিক নির্যাতনের ক্ষত নিয়ে বহু নারীকর্মীকে দেশে ফিরতে দেখা গেছে। করোনা মহামারীতে তাদের আরও ভয়ানক পরিস্থিতি মোকাবেলা করতে হচ্ছে, যারা প্রায় সবাই গৃহকর্মী হিসাবে নিযুক্ত আছেন। লকডাউনে যেভাবে বেড়েছে পারিবারিক নির্যাতন, সেভাবে নির্যাতনের মাত্রা বেড়েছে নারী গৃহকর্মীদের উপরও। অভিবাসী নারী কর্মীদের একটা বড় অংশই বিধবা বা তালাকপ্রাপ্তা নারী, দেশে রয়েছে যাদের পরিবারের কিছু অসহায় সদস্য। তাদেরও দরকার জরুরি সহায়তা।

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

আপনার মন্তব্য লিখুন