প্রবাসীদের নিজের প্রতি নজর দেয়া বেশি জরুরী

0

পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতা ও উন্নত জীবনের আশায় প্রতিদিন হাজার হাজার যুবক পাড়ি জমাচ্ছে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে। সুদে টাকা নিয়ে ভিটেবাড়ি বন্ধক দিয়ে চড়া দামে ভিসা নিয়ে অনেকেই আবার টাকার বিনিময়ে চুক্তি করে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে পাড়ি জমায় সমুদ্র পথে।

প্রবাসীরা রাত দিন মাথার ঘাম পায়ে ফেলে পরিশ্রম করে যায় শুধুমাত্র পরিবারের সুখ আর শান্তির জন্য। দুই ঈদ ও বিভিন্ন উৎসবে সবাই মজা আনন্দ করে। প্রবাসে ঈদের দিনেও কাজে যেতে হয়। কর্মস্থলে সহপাঠীদের সঙ্গে ঈদের আনন্দটুকু ভাগাভাগি করে নেয় নিজেদের মত করে। আবার বেশিরভাগ দেশেই নিজ দেশের বাংলাদেশিদের কারণে বেতন, আকামাসহ নানা ধরণের ঝামেলার মধ্যে দিন কাটে প্রবাসীদের।

মাস শেষে যখনই বেতন হাতে পায় সেই বেতনের টাকা কখন দেশে পরিবারে কাছে পাঠাবে সেই চিন্তায় অস্থির থাকে। আবার অনেক সময় দেখা যায় কাজ করেও মাস শেষে ঠিকমত বেতন পায় না। বেতন দিতে দেরি হলে দেশ থেকে ফোন আসে। মাসতো শেষ, টাকা কোথায়? পাড়ার দোকানে ও পাওনাদাররা আসছে আরো শোনায় নানা ধরণের কথা।

পরিবারের বিভিন্ন জনের কাছ থেকে নানাবিধ চিন্তায় বাসা বাঁধে হ্রদরোগের মত নিরব ঘাতক। প্রতিদিন শোনা যায় ওমুক নামের ওমুক উপজেলার এক প্রবাসী ভাই স্ট্রোক করে মারা গেছে। এ ধরণের সংবাদ প্রতিদিনই চোখে পড়ে ফেসবুক খুললে। যাদের আত্মীয় স্বজন থাকে মৃত প্রবাসী মরদেহ দ্রুত দেশে পাঠাতে সম্পন্ন করতে শুরু করে আইনী কার্যক্রম। বিভিন্ন জনের সহযোগিতায় কফিন বন্দি করে মরদেহ দেশে পাঠায়।

কোন প্রবাসী বিদেশে মারা গেলে বাংলাদেশ সরকার লাশ দাফনের জন্য ৩৫ হাজার টাকা এবং পরর্বতীতে তিন লক্ষ টাকা প্রদান করে। কিন্তু কেউ একজন বিদেশে মারা গেলে একটি লাশ কিভাবে দেশে আসে সেই খোজ কেউ রাখে না।

পাড়া প্রতিবেশি আত্মীয় স্বজন গুঞ্জন করে লাশের সঙ্গে কত টাকা আসছে? শুধুমাত্র মা বাবা ছাড়া প্রায় সবার মনে এ কৌতূহল জাগে কত টাকা এসেছে কফিনের সঙ্গে। লাশ আসার আগে পাওনাদারেরা এসে বসে থাকে টাকার জন্য। অনেক সময় লাশ দাফন দিতেও বাঁধা দেয়ার ঘটনা শোনা যায়। বেশিরভাগ শ্রমিক হিসেবে কম বেতনে কাজ করে যা পায় তা দিয়ে কোন রকমে সংসার চলতো। সংগঠন বা বন্ধু বান্ধব মিলে প্রবাসীদের কাছ থেকে টাকা তুলে যে যা পারে সহযোগিতা করে। এমনও প্রবাসীর মরদেহ হিমঘরে বক্সে পড়ে আছে যার খোজ খবর নেয়ার কেউ নেই।

দেখা যায় এদের মধ্যে বেশির ভাগ নকল পাসপোর্ট, বা অবৈধ পথে আসা প্রবাসীরা। অনেক সময় বাংলাদেশের নাগরিক ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, অন্যদেশে পাসপোর্ট নিয়ে প্রবেশ করেন। তথ্য গরমিল থাকার কারণে খোজ না পেলে বেওয়ারিশ লাশ হিসেবে দাফন দিয়ে দেয়া হয়। কুয়েতস্থ বাংলাদেশ দূতাবাসের তথ্য মতে, ২০১৭ সালে কুয়েতে ২১৭ ও ২০১৮ সালে ২৫৩ জন প্রবাসী মারা যায়, যার মধ্যে বেশিরভাগই স্ট্রোক করে।

পরিবারে সুখের ও শান্তির জন্য আসা প্রবাসী যখন অসুস্থ হয়ে দেশে যায় কিছুদিন পর টাকার অভাবে সেই প্রবাসী ও তার পরিবার মানবেতর জীবন যাপন করে। আগে যে পরিবার দশ জনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলেছে এখন চোখ শরমে আত্মীয় স্বজন কারো কাছে বলেতে পারে না নিরব কান্না আর দুঃখে জীবন যায় তাদের।

তাই প্রবাসীদের নিজের প্রতি নজর দেয়া বেশি জরুরী। সবচেয়ে জরুরী নিজের শরীরের যত্ন নেয়া, খেয়াল রাখা। মনের প্রশান্তির জন্য ছুটির দিনগুলোতে আত্মীয় স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে মিলিত হওয়া। এতে মনের মধ্যে দুঃখ-কষ্ট কমে থাকবে। কমে যাবে মানসিক চাপ ও অশান্তি ।
সে সাথে নিজের জরুরী প্রয়োজনের জন্য সঞ্চয় করা। প্রতিটি প্রবাসী তার পরিবারের শান্তি ও সুখের জন্য পরিশ্রম করে আয় করে। সেই আয়ের কিছু টাকা নিজের নামে ব্যাংক একাউন্ট বা বীমা করে রাখে যাতে হঠাৎ কোন দুর্ঘটনার সময় কাজে লাগাতে পারে। কারণ বিপদে পড়লে অনেক কাজের মানুষকে আর পাশে পাওয়া যায় না।
লেখক : সাদেক রিপন, প্রবাসী সাংবাদিক

[প্রিয় পাঠক, আকাশযাত্রা প্রবাস বিভাগে আপনিও লিখতে পারেন। রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিকসহ কমিউনিটির নানান খবর, সংগঠনের খবর, ভ্রমণ, আড্ডা,আনন্দ-বেদনার গল্প, ছোট ছোট অনুভূতি, দেশের স্মৃতিচারণসহ যে কোনো বিষয়ে লিখে পাঠাতে পারেন। লেখা ছবিসহ মেইল করুন [email protected] এই ঠিকানায়।]

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

Loading...