প্রণোদনায় রেমিট্যান্স প্রবাহে নতুন গতি

0

রেমিট্যান্স এখন পৃথিবীর নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোর বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের সবচেয়ে বড় উৎস হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে সার্বিকভাবে এখন রেমিট্যান্স এবং এফডিআই প্রবাহের পরিমাণ প্রায় সমান। উন্নয়ন কার্যক্রমে অর্থায়নের ক্ষেত্রে রেমিট্যান্স সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উৎসে পরিণত হতে চলেছে। যেসব কারণে রেমিট্যান্সের পরিমাণ বাড়ছে, সেগুলোর পরিসর আরো বিস্তৃত হবে আগামী দিনগুলোতে।

উচ্চ আয়ের দেশের মানুষের গড় আয় যেখানে ৪৩ হাজার ডলার,সেখানে নিম্ন আয়ের দেশে তা মাত্র ৭৯৫ ডলার। এই বৈষম্যের কারণে নিম্ন আয়ের দেশের মানুষেরা উন্নত দেশগুলোতে পাড়ি জমাচ্ছেন অধিকতর উপার্জনের লক্ষ্য নিয়ে। আবার উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর সংখ্যা কমছে, অন্যদিকে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে বাড়ছে। ফলে উচ্চ আয়ের দেশগুলো বাধ্য হয়ে নিম্ন আয়ের দেশ থেকে অভিবাসী শ্রমিক নিয়ে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হলো বিদেশে থাকা বাংলাদেশিদের পাঠানো অর্থ বা রেমিট্যান্স। বর্তমানে এক কোটির বেশি বাংলাদেশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থান করছেন। জিডিপিতে তাদের পাঠানো অর্থের অবদান ১২ শতাংশের মতো।

বিশ্বব্যাংকের হিসাব মতে, প্রবাসী আয় প্রাপ্তিতে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে নবম অবস্থানে রয়েছে। ২০১৮ সালে প্রবাসী বাংলাদেশিরা ১ হাজার ৫৫০ কোটি ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। স্থানীয় বাজারে ডলারের তেজিভাব এবং হুন্ডি ঠেকাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নানা পদক্ষেপের কারণে বেশ কিছুদিন ধরেই রেমিট্যান্স বাড়ছে।

সেই ধারাবাহিকতায় অর্থনৈতিক উন্নয়নে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের গুরুত্ব বিবেচনায় দেশের উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার লক্ষ্যে রেমিট্যান্সে বিশেষ প্রণোদনা দেয়ার যুগান্তকারি উদ্যোগ নেয় সরকার। বৈধ উপায়ে দেশে পাঠাতে উৎসাহিত করতে নেওয়া এ প্রণোদনা সুবিধা ওয়েজ আর্নার্স রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে।

২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে রেমিট্যান্স তথা প্রবাসী আয়ে ২ শতাংশ নগদ প্রণোদনার ঘোষণা দেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। এরপর ৬ আগস্ট এ বিষয়ে নীতিমালা জারি করে বাংলাদেশ ব্যাংক। বাজেটে এ জন্য ৩ হাজার ৬০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। আশা করা হয় রেমিট্যান্সে প্রণোদনায় হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাঠানো কমবে।

প্রবাসী শ্রমিক
প্রবাসী শ্রমিক

বিদেশ থেকে পাঠানো প্রবাসী বাংলাদেশিদের রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রে রেমিট্যান্স আহরণকারী ব্যাংক প্রচলিত বিধিবিধান পরিপালন করে উপকারভোগী অর্থাৎ বেনিফিশিয়ারির হিসাবে জমা অথবা উপকারভোগীকে দেয়ার সময় ওই অর্থের ওপর ২ শতাংশ হারে নগদ সহায়তা দেবে। একজন প্রবাসীর পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপর প্রতিবারে সর্বোচ্চ ১৫০০ মার্কিন ডলার সমমূল্যের অর্থের জন্য প্রণোদনা হিসেবে ২ শতাংশ হারে নগদ সহায়তা দেবে।

বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে পূর্ববর্তী এক বছরের রেমিট্যান্স আহরণের গড় মাসিক অঙ্কের ভিত্তিতে তিন মাসের জন্য প্রয়োজনীয় নগদ সহায়তার অনুমিত পরিমাণের তহবিল সরকারি বরাদ্দ থেকে বাংলাদেশ ব্যাংক ইমপ্রেস্ট আগাম আকারে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের অনুকূলে হস্তান্তর করছে। তফসিলি ব্যাংকের অনুকূলে বাংলাদেশ ব্যাংক প্রদত্ত ইমপ্রেস্ট তহবিল শেষ হয়ে গেলেও ব্যাংকগুলো নিজ তহবিল থেকে নির্ধারিত হারে নগদ সহায়তা দেয়া অব্যাহত রাখবে।

পরবর্তী সময়ে তাদের চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের কাছ থেকে তহবিল প্রাপ্তির পর তা পুনঃভরণ করা হবে। রেমিট্যান্স প্রাপকের অনুকূলে নগদ প্রণোদনা সহায়তা প্রদানে অযথা বিলম্ব কিংবা হয়রানি করা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক এবং জড়িত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা জারি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগ।

বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো রেমিট্যান্সে এ ধরনের প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে। ১ জুলাই থেকে প্রবাসীরা ১০০ টাকা দেশে পাঠালে ২ টাকা প্রণোদনা পাবেন। ব্যাংকে গেলেই প্রবাসী আয়ের প্রণোদনার টাকা পাওয়া যাবে।

এরই মধ্যে এই প্রণোদনা দেয়া শুরু হয়েছে। রেমিট্যান্স প্রবৃদ্ধিতে যার ইতিবাচক প্রভাব ইতোমধ্যে পড়তে শুরু করেছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাসেই রেকর্ড সাড়ে চার বিলিয়ন ডলারের বেশি রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা। এই অঙ্ক গত বছরের একই সময়ের চেয়ে ১৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ বেশি।

প্রতি বছর দুই ঈদের পর রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যায়। আগস্টে কুরবানির ঈদের পর ধারণা করা হয়েছিল সেপ্টেম্বরে প্রবাসীরা কম রেমিট্যান্স পাঠাবেন। কিন্তু এবার তেমন হয়নি। সেপ্টেম্বরে ১৪৬ কোটি ৮৪ লাখ ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন তারা। যা মাসের হিসাবে বাংলাদেশের ইতিহাসে চতুর্থ সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স। এর আগে গত মে মাসে রোজার ঈদকে সামনে রেখে ১৭৪ কোটি ৮১ লাখ ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছিল প্রবাসীরা। যা ছিল মাসের হিসাবে বাংলাদেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ।

দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছিল জুলাই মাসে; ১৫৯ কোটি ৭৭ লাখ ডলার। তৃতীয় সর্বোচ্চ রেমিট্যান্স এসেছিল ২০১৮ সালের মে মাসে ১৫০ কোটি ৫০ লাখ ডলার। দুই শতাংশ হারে প্রণোদনা, জনশক্তি রপ্তানি বৃদ্ধি এবং বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা। এ ছাড়া বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার হয়েছে। সেসব দেশে অবস্থানকারী আমাদের প্রবাসীরা এখন বেশি মজুরি পাচ্ছেন; বেশি অর্থ দেশে পাঠাচ্ছেন। এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে জনশক্তি রপ্তানি বাড়ায় রেমিট্যান্স প্রবাহে ইতিবাচক প্রভাব পড়েছে।

২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) ৪৫১ কোটি ৪ লাখ (৪ দশমিক ৫১ বিলিয়ন) ডলারের রেমিট্যান্স এসেছে বাংলাদেশে। এর আগের অর্থ বছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে এসেছিল ৩৮৬ কোটি ৮৯ লাখ (৩ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন) ডলার। এ হিসাবেই এই তিন মাসে রেমিট্যান্সে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ১৬ দশমিক ৫৮ শতাংশ। গত ২০১৮-১৯ অর্থবছরে এক হাজার ৬৪১ কোটি ৯৬ লাখ (১৬ দশমিক ৪২ বিলিয়ন) ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন প্রবাসীরা।

বৈরুতের তাইয়ুনি এলাকার ওয়েষ্টার্ন ইউনিয়নের শাখায় দেশে টাকা পাঠাচ্ছেন প্রবাসীরা

এই অঙ্ক আগের বছরের (২০১৭-১৮) চেয়ে ৯ দশমিক ৬ শতাংশ এবং অতীতের যে কোনো বছরের চেয়ে বেশি। বাংলাদেশের ইতিহাসে এর আগে কখনই এক বছরে এই পরিমাণ রেমিট্যান্স আসেনি। ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এক হাজার ৪৯৮ কোটি ১৭ লাখ (১৪ দশমিক ৯৮ বিলিয়ন) ডলারের রেমিট্যান্স পাঠিয়েছিলেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অবস্থানকারী প্রবাসীরা। ওই অঙ্ক ২০১৬-১৭ অর্থবছরের চেয়ে ১৭ দশমিক ৩২ শতাংশ বেশি ছিল।

তাই নিঃসন্দেহে বলা যায, রেমিট্যান্সে প্রণোদনা দিয়ে একটি ভালো সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ফলে প্রবাসীরা দেশে বেশি অর্থ পাঠাচ্ছেন। অর্থনীতিতে আরো বেশি অবদান রাখছেন।

এদিকে রেমিট্যান্স বাড়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের বিদেশি মুদ্রার সঞ্চয়নও (রিজার্ভ) সন্তোষজনক অবস্থায় রয়েছে। দেশের সব খাত ঋণাত্মক দিকে প্রবাহিত হলেও রেমিট্যান্স খাত কখনো পেছনের দিকে যাবে না। দিনে দিনে আমাদের রেমিট্যান্স আহরণ বাড়ছে, ভবিষ্যতে আরো বাড়বে, প্রত্যাশা করা যায়।

রেজাউল করিম খোকন : ব্যাংকার ও লেখক।

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

Loading...