চীনের উচ্চশিক্ষার আলো বিশ্বে ছড়াচ্ছেন বাংলাদেশি মারুফ মোল্লা
ডাক্তার মারুফ মোল্লা। এই নামটির সাথে জড়িয়ে আছে বিশ্বের ১৭টি দেশের হাজার হাজার মেধাবী শিক্ষার্থীর স্বপ্ন পূরণের গল্প। বাংলাদেশের এক প্রত্যন্ত গ্রামের অভাব-অনটনে বড় হওয়া ছেলেটি আজ চীনের উচ্চশিক্ষাকে বিশ্বমঞ্চে ছড়িয়ে দেওয়ার ‘গ্লোবাল অ্যাম্বাসেডর’। যার হাত ধরে গত ১৪ বছরে প্রায় ৩০ হাজার শিক্ষার্থী চীনের নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার সুযোগ পেয়েছেন, যার অধিকাংশই শতভাগ স্কলারশিপ নিয়ে। আজ তিনি বেইজিং থেকে কলম্বো, কাসাব্লাঙ্কা থেকে ব্যাংকক পর্যন্ত এক পরিচিত নাম।
শৈশবের সংগ্রাম ও অনুপ্রেরণার উৎস
মারুফ মোল্লার জীবনের শুরুটা ছিল ভীষণ কণ্টকাকীর্ণ। গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলার এক অতি সাধারণ কৃষক পরিবারে তার জন্ম। মাত্র দুই বছর বয়সে মা হারান। দারিদ্র্য ছিল তার নিত্যসঙ্গী। নানা বাড়িতে অভাবের মধ্যেই বড় হয়েছেন তিনি। তবে তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দেন তার আপন মামা শেখ কোরবান আলী।মামা কোরবান আলী নিজেও ছিলেন প্রচণ্ড মেধাবী। ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি থেকে ইলেকট্রনিক্স অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়াশোনা শেষ করে তিনি চীনা ভাষা শেখেন এবং স্কলারশিপ নিয়ে চীনে পাড়ি জমান। ভাগিনা মারুফের মেধা দেখে তিনি তাকেও ঢাকায় নিয়ে আসেন এবং আধুনিক শিক্ষার সুযোগ করে দেন। মারুফ মাধ্যমিক পরীক্ষায় দুর্দান্ত ফলাফল করে ঢাকার আদমজী ক্যান্টনমেন্ট কলেজে ভর্তি হন এবং মামার অনুপ্রেরণায় চীনা ভাষা শিখতে শুরু করেন।
চীন যাত্রা
কোরবান আলীর হাত ধরেই মারুফ মোল্লা চীনের শেনডং ইউনিভার্সিটিতে ল্যাঙ্গুয়েজ কোর্সে ভর্তি হন। সেখানে ১৪০টি দেশের শিক্ষার্থীদের ভিড়ে নিজের মেধার স্বাক্ষর রাখেন তিনি। যেখানে অন্যরা চীনা ভাষার দক্ষতা অর্জনে হিমশিম খাচ্ছিল, সেখানে মারুফ রেকর্ড সময়ে এইচএসকে-৫ (HSK-5) সম্পন্ন করেন। পড়াশোনার পাশাপাশি তার ব্যবসায়িক বুদ্ধির প্রকাশ ঘটে প্রথম বর্ষেই। সেই সময় চীনে কল রেট ছিল অনেক বেশি। মারুফ ভিওআইপি (VOIP) সার্ভিসের মাধ্যমে কম খরচে কথা বলার সুযোগ এবং অনলাইনে কেনাকাটার সুবিধা দিয়ে সহপাঠীদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। ব্যাচেলর শুরু করার আগেই তিনি প্রতি মাসে ৪ হাজার আরএমবি আয় করতে শুরু করেন। 
চিকিৎসা শাস্ত্রে সাফল্য ও একটি কঠিন সিদ্ধান্ত
শেনডংয়ের ভাষা কোর্স শেষ করে মারুফ চীনের অন্যতম সেরা বিদ্যাপীঠ সান ইয়েট সেন ইউনিভার্সিটিতে এমবিবিএস-এ ভর্তি হন। এমবিবিএস ও পরবর্তীকালে অনকোলজিতে বিশেষায়িত ডিগ্রি নিয়ে তিনি একজন দক্ষ হেপাটোবিলিয়ারি সার্জন হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। সপ্তাহে ১৪টিরও বেশি জটিল অপারেশন এবং হাসপাতালে ৫৪ জন রোগীর দায়িত্ব সামলাতেন তিনি। কিন্তু একদিকে সফল ডাক্তারি পেশা, অন্যদিকে ক্রমবর্ধমান স্টুডেন্ট কনসালটেন্সি ব্যবসা—এই দুইয়ের টানাপোড়েনে তিনি একটি সাহসী সিদ্ধান্ত নেন। ২০২০ সালের করোনা মহামারির সময় তিনি ডাক্তারি পেশা ছেড়ে পূর্ণকালীনভাবে শিক্ষামূলক কার্যক্রমে মনোযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি উপলব্ধি করেন, একজন সার্জন হিসেবে তিনি দিনে কয়েকজনের সেবা দিতে পারছেন, কিন্তু শিক্ষা উদ্যোক্তা হিসেবে তিনি হাজারো মানুষের ভবিষ্যৎ গড়তে পারবেন। 
‘মালিশাএডু’ও বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ
২০১২ সালে মামা শেখ কোরবান আলী, তার চীনা স্ত্রী এবং মারুফ মোল্লার সমন্বয়ে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘মালিশাএডু’ (MalishaEdu)। ২০১৩ সালে চীন সরকার যখন ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ (BRI) শুরু করে, তখন চীনের উচ্চশিক্ষা খাতে বিদেশি শিক্ষার্থীদের অনীহা ছিল প্রধান বাধা। মারুফ মোল্লা এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করেন। ২০১৬ সালে তিনি নিজস্ব তহবিল থেকে ৩০ লাখ টাকা খরচ করে বাংলাদেশে বিশাল সেমিনার করেন। সেই সময় চীনের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তির ক্ষেত্রে বড় বাধা ছিল ‘সিকিউরিটি ডিপোজিট’। মারুফ মোল্লা নিজের ব্যক্তিগত গ্যারান্টিতে সেই নিয়ম শিথিল করান এবং এক বছরেই ৪০০ শিক্ষার্থীকে চীনে পাঠান। বর্তমানে চীনের শীর্ষ ২৫০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে তার প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক চুক্তি রয়েছে।
বিশ্বমঞ্চে চীনের প্রতিনিধি
আজ মারুফ মোল্লা কেবল বাংলাদেশের নন, বরং চীনের হয়ে বিশ্বজুড়ে কাজ করছেন। ১৭টি দেশে তার প্রতিষ্ঠানের অফিস রয়েছে। বিশেষ করে মরক্কো, শ্রীলঙ্কা, ইথিওপিয়া এবং উজবেকিস্তানে তার ব্যাপক জনপ্রিয়তা। মরক্কো: এখান থেকে প্রতি বছর সর্বোচ্চ সংখ্যক শিক্ষার্থী তার মাধ্যমে চীনে যায়। শ্রীলঙ্কা: শ্রীলঙ্কার সরকারের সাথে তার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক; সেখানে তিনি রাষ্ট্রীয় আতিথেয়তা পান। ইথিওপিয়া ও মিশর: এসব দেশেও তিনি বিশেষ সম্মাননা লাভ করেছেন। গত ডিসেম্বরে তার প্রতিষ্ঠান আয়োজন করে ‘থার্ড বেল্ট এন্ড রোড চাইনিজ ইউনিভার্সিটি এন্ড ওভারসিজ পার্টনার এক্সচেঞ্জ কনফারেন্স’, যেখানে বিশ্বের ১৫৫টি দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। 
চীনে মেডিকেল ট্যুরিজমের অগ্রদূত
শিক্ষার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসেবাতেও বিপ্লব এনেছেন মারুফ মোল্লা। বাংলাদেশি রোগীদের জন্য চীনের আধুনিক চিকিৎসা নিশ্চিত করতে তিনি চালু করেছেন ‘বেল্ট এন্ড রোড হেলথকেয়ার’। ২০২৫ সালের মার্চে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশিরা এখন সহজেই চীনের উন্নত চিকিৎসা সেবা নিতে পারছেন। এমনকি রোগীদের সুবিধার্থে চীনা দূতাবাস ‘গ্রিন চ্যানেল’ ভিসা সুবিধা চালু করেছে।
কর্মসংস্থান ও নিরলস পরিশ্রম
বর্তমানে ৩২ বছর বয়সী এই তরুণের প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন ১৩০ জনেরও বেশি কর্মী। বিভিন্ন দেশের সময়ের ব্যবধানের সাথে তাল মেলাতে মারুফ প্রতিদিন গড়ে ১৮ ঘণ্টা কাজ করেন। বর্তমানে তিনি ৮টি চীনা বিশ্ববিদ্যালয়ে লেকচারার এবং গেস্ট প্রফেসর হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
মালিশা ফাউন্ডেশন
শিকড়কে না ভোলার গল্পআকাশচুম্বী সাফল্য পেলেও মারুফ মোল্লা ভোলেননি তার সেই ছনের ঘরের স্মৃতি। নিজের অতীতকে সম্মান জানাতে এবং মেধাবী দরিদ্র শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াতে তিনি গঠন করেছেন ‘মালিশা ফাউন্ডেশন’। কার্যক্রমের ধরণবিস্তারিত বিবরণ শিক্ষা সহায়তাদেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত আর্থিক অনুদান প্রদান। অবকাঠামো উন্নয়ন নিজামকান্দি হাইস্কুলে নিজ অর্থায়নে অত্যাধুনিক নতুন ভবন নির্মাণ। স্কলারশিপ বিনা খরচে মেধাবী শিক্ষার্থীদের চীনে উচ্চশিক্ষার সুযোগ করে দেওয়া। 
আগামীর স্বপ্ন: আধুনিক বাংলাদেশ
মামা-ভাগিনা জুটির এখন একটাই লক্ষ্য—নিজের অর্জিত জ্ঞান ও সম্পদ দেশের কাজে লাগানো। তারা স্বপ্ন দেখেন: বাংলাদেশে একটি বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে নামমাত্র খরচে দেশি-বিদেশি শিক্ষার্থীরা পড়বে। একটি অত্যাধুনিক হাসপাতাল নির্মাণ করা, যেখানে বিদেশের দক্ষ চিকিৎসকরা এসে সেবা দেবেন, যাতে কোনো বাংলাদেশিকে চিকিৎসার জন্য জমি বিক্রি করে বিদেশে যেতে না হয়।
গোপালগঞ্জের সেই এতিম ও দরিদ্র কিশোরটি আজ বিশ্বের ১৭টি দেশে মেধার আলো ছড়াচ্ছেন। মারুফ মোল্লার এই জীবনকাব্য প্রমাণ করে যে, অদম্য ইচ্ছা শক্তি, সঠিক দিকনির্দেশনা এবং কঠোর পরিশ্রম থাকলে পৃথিবীর কোনো বাধাই স্বপ্ন ছোঁয়ার পথে অন্তরায় হতে পারে না। তিনি কেবল একজন সফল উদ্যোক্তা নন, তিনি আধুনিক বাংলাদেশের এক গর্বিত প্রতিনিধি।


