চার্টার্ড ফ্লাইটে যেভাবে পালালেন অটোমোবাইলস টাইকুন ঘোসন

চার পাইলটসহ আটক ৭

0

কার্লোস ঘোসন। ফরাসি ব্যবসায়ী। ব্রাজিলে জন্ম নেওয়া লেবাননের বংশধর। এই তিন দেশেরই নাগরিক তিনি। দীঘ বর্ণাঢ্য জীবনে ঘোসন জাপানের গাড়ি প্রস্তুতকারক নিসানের চেয়ারম্যান ও সিইও এবং মিতসুবিশি মোটরসের চেয়ারম্যান মিশেলিন নর্থ আমেরিকার চেয়ারম্যান, রেনল্টের সিইও, অ্যাভটোভিএজেডের চেয়ারম্যান ও সিইও হিসাবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ঘোসন রেনল্ট – নিসান – মিতসুবিশি কনসোটিয়ামেরও চেয়ারম্যান এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ছিলেন,যেটি বিশ্বব্যাপী বৃহত্তম অটোমোবাইল গ্রুপ হিসাবে গণ্য হয়েছিল।

জাপানের আদালতে দুর্নীতি ও অর্থ কেলেংকারীর একাধিক মামলায় বিচারে মূখোমুখি ৬৫ বছর বয়সী এই ব্যবসায়ী জামিনে থাকা অবস্থায় দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠা এই ঘটনায় বেকয়দায় পড়েছে জাপান সরকার।

গত ২৯ ডিসেম্বর রাতে সবার অগোচরে চার্টার্ড উড়োজাহাজে করে জাপান থেকে লেবানন পালিয়ে যান দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত অটোমোবাইলস টাইকুন কার্লোস ঘোসন।

তাকে উড়োজাহাজে করে জাপান থেকে পালাতে সহায়তার অভিযোগ উঠেছে তুরস্কের বিমানসংস্থা এমএনজি’র বিরুদ্ধে। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তারা নাম প্রকাশ না করে এ ঘটনার সাথে তাদের এক পাইলটের জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছেন।

এমএনজি’র বিবৃতিতে জানানো হয়, অভিযুক্ত ঔ পাইলট ভুয়া কাগজপত্র ব্যবহার করে কার্লোস ঘোসনের নাম গোপন রেখে জাপান থেকে দুটি চার্টার উড়োজাহাজ বরাদ্দ করেন। এ ঘটনায় অভিযুক্তের বিরুদ্ধে পহেলা জানুয়ারি তুরস্কে একটি আনুষ্ঠানিক অভিযোগপত্র দায়ের সংস্থাটির কর্তৃপক্ষ।

তুরস্কের অভ্যন্তরীণ মন্ত্রনালয় জানায়, তারা এর মধ্যে এ ঘটনায় চার পাইলটসহ মোট সাতজনকে আটক করেছে। নাম প্রকাশ না করা এই সাতজনের মধ্যে চার পাইলট ছাড়াও দুজন মালামাল হ্যান্ডলিং প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী ও একজন কার্গো কোম্পানির কর্মচারী রয়েছে।

এম এন জি’র ব্যবস্থাপক কেন সাসমাজের মতে, তারা দুটো উড়োজাহাজ দুজন ভিন্ন ভিন্ন যাত্রীর জন্য বরাদ্দ করেছিল। এর একটি ফ্লাইট ছিল দুবাই থেকে জাপানের ওসাকা হয়ে তুরস্কের ইস্তাম্বুল, অন্যটি ইস্তাম্বুল হয়ে লেবাননের বৈরুত। এর মধ্যে দুটি উড়োজাহাজই ছিল বোমবার্ডিয়ার মডেলের।

এ নিয়ে তাদের অভ্যন্তরীণ তদন্তও চলছে জানিয়ে লিখিত বিবৃতিতে কেন সাসমাজ বলেন, এর মধ্যে এক পাইলট জালিয়তি করে কর্তৃপক্ষের নজর এড়িয়ে এমন ঘটনা ঘটানোর কথা স্বীকার করেছেন। তাছাড়া এ ঘটনায় সন্দেহজনক আরো যারা আছেন তাদের সকলের ব্যাপারেই জোর তদন্ত চলছে।

এম এন জি’র দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, তারা এই দুটি উড়োজাহাজ চুক্তির ভিত্তিতে সাময়িকভাবে পরিচালনা করছে। তবে এই দুটি ফ্লাইট বরাদ্দের ক্ষেত্রে দুজন যাত্রীর নাম ব্যবহার হওয়ায় একটি আরেকটির সাথে সম্পর্কিত মনে হয়নি। তার উপর দুটিতেই কার্লোস ঘোসনের নাম গোপন করা হয়েছিল।

তুরস্কের অভ্যন্তরীণ মন্ত্রণালয় আরো জানায় ডিসেম্বরের শেষ দুই তিনদিনে কার্লোস ঘোসনের তুরস্কে প্রবেশ বা তুরস্ক থেকে চলে যাওয়ার কোন প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তবে দুটি উড়োজাহাজই আতাতুর্ক বিমানবন্দরে হাভাস সেলেভির তত্ত্বাবধানে উঠা-নামা করেছে।

ঘোসনকে পালাতে সহায়তা করা দুটি উড়োজাহাজের মালিকানা নিয়েও তৈরি হয়েছে বেশ ধূম্রজালের। জানা গেছে, এর একটি গ্লোবাল ৬০০০ উড়োজাহাজ আগে কাতার সরকারের আমিরি ফ্লাইটের বহরে ছিল। পরে এটি ২০১৮ সালে তুর্কিশ এয়ারের যুক্ত হয়। অন্য আরেকটি উড়োজাহাজ চ্যালেঞ্জার ৩০০ ২০১২ তে তুর্কিশ বিমানসংস্থায় যুক্ত হয় তবে পরে তা তুরস্কের লিজিং কোম্পানি হালক ফিনানসাল কিরালামার মালিকানায় চলে যায়।

এমএনজি এই দুটি উড়োজাহাজের মালিকানা নিয়ে তেমন কিছু বলতে রাজি হয়নি। তারা ঘোসনের দুটি ফ্লাইটের যাত্রীসংখ্যার ব্যাপারেও কিছু বলেনি, যদিও তারা জানিয়েছে যে পূর্বে কখনোই ঘোসন তাদের কোন ফ্লাইটের যাত্রী ছিলেন না।

তবে এটুকু নিশ্চিত হওয়া গেছে যে ডিসম্বরের ৩১ তারিখ নিশানের সাবেক সিইও কার্লোস ঘোসনকে, ইস্তাম্বুলে উড়োজাহাজ বদলের পর লেবানেন রাজধানী বৈরুতে দেখা গেছে। গেল বৃহস্পতিবার ইন্টারপোল, কার্লোস ঘোসনকে আটকে লেবানন পুলিশের কাছে একটি রেড এলার্ট নোটিশ দিয়েছে।

২০১৯ এর এপ্রিলে ৮.৯ বিলিয়ন ডলার দিয়ে জাপানের একটি আদালত থেকে জামিনে বেরিয়ে আসে আর্থিক দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত এই সাবেক নিশান কর্মকর্তা। জামিন পেলেও এ মামলায় তার জাপান ত্যাগে নিষেধাজ্ঞা ছিল। লেবাননের জাতীয়তার পাশাপাশি কার্লোসের ফরাসী এবং ব্রাজিলিয়ান নাগরিকত্ব থাকলেও মামলার কারণে তার সব পাসপোর্ট জমা ছিল জাপানি পুলিশের কাছে।

বিমানবন্দরে ফ্লাইট উঠানামা পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, জাপানের ওসাকা থেকে ২৯ ডিসেম্বর রাত ১১ টায় একটি বোমবার্ডিয়ার গ্লোবাল এক্সপ্রেস উড্ডয়ন করতে দেখা গেছে যা ইস্তাম্বুলের আতাতুর্ক বিমানবন্দরে স্থানীয় সময় ভোর ৫.২৬ এ অবতরণ করে। পরে ভোর ৬,৩০ এ একটি বোমবার্ডিয়ার চ্যালেঞ্জার ৩০০ ইস্তাম্বুল ছেড়ে যায় যা বৈরুতে পৌছে স্থানীয় সময় সকাল ৬.৪১ এ।

রোববার এই ঘটনা সম্পর্কে প্রথম সরকারি ভাষ্য দিয়ে জাপানের বিচারমন্ত্রী বলেছেন,’জাপান থেকে কার্লোস ঘোসনের পলায়ন “সমর্থযোগ্র নয়” এবং “অবৈধ পদ্ধতি” ব্যবহার করে তিনি দেশ ত্যাগ করেছেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।’

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

Loading...