কবুতর, হাতের রেখা আর বিদেশ ভাগ্য

0

সম্ভবত: কলেজ জীবনের একদিন। ‘লাভ ইন সিঙ্গাপুর’ মুভি দেখতে গেছি। চট্টগ্রামে বাসার কাছে সিনেমা প্যালেসে। সিঙ্গাপুরের প্রেমে মজে গেলাম। এতো সুন্দর দেশটা! ঝাঁ চকচকে রাস্তা, ভিউকার্ডের মতো দেখতে সবকিছু! মনে মনে স্বপ্ন বুনে ফেলি — ‘বিদেশ’ আমাকে যেতেই হবে। সিঙ্গাপুর না হোক, ঐরকম একটা দেশ হলেও চলবে।

হল থেকে বের হয়ে কেসিদে রোডের ফুটপাতে দেখি চক্রাকার ছোট্ট এক জটলা। সন্ধ্যা ছুঁই ছুঁই। বাসায় ফিরতে হবে। কিন্তু মন তো আজ আমার ফুরফুরে। উড়ছে। কৌতুহল হলো। হালকা পাতলা মানুষ আমি। মাথা গলিয়ে দিতে সমস্যা হলো না। দেখি এক লোক হাতে চিকন কাঠি নিয়ে বসে আছে। চাটাইয়ে। সামনে অনেকগুলো খাম রাখা, আর তার ওপর দিয়ে একটি কবুতর হেঁটে যাচ্ছে। এবং কবুতর যেখানে গিয়ে থামছে, লোকটি সেই খাম তুলে নিচ্ছে এবং ভেতর থেকে এক টুকরো কাগজ বের করে জানিয়ে দিচ্ছে ‘ভাগ্য।’ কেউ কেউ হাতও দেখিয়ে দিচ্ছে। হাতের রেখা দেখে ও পাম রিডিংয়ের বইয়ের সঙ্গে মিলিয়েও ভাগ্য গণনা করছে। ইন্টারেস্টিং! কবুতর ও হাতের রেখা মানুষের ভাগ্য বলে দেয়?

মাথায় আমার তখন সিঙ্গাপুরের তরতাজা ‘হ্যাংগওভার।’ বললাম, দেখুন তো আমার বিদেশ-ভাগ্য আছে কি না। মুচকি হেসে জ্যোতিষ বাবু উনার কবুতরকে নির্দেশ দিলেন। আমি এক্সাইটেড। কবুতর হাঁটছে তো হাঁটছেই। বেশ ক’সেকেন্ড পর থামলো। “আপনার বিদেশ ভ্রমণের সম্ভাবনা নাই,” জানিয়ে দিলো কবুতর। থেমেছিলো ১৩ নং খামে!

“আইচ্ছা, আপনার হাতের রেখা দেখিতো ভাইয়া,” ঐ লোকের বিকল্প অফার। ‘বিদেশ’ আমার সফট কর্ণার, হাত বাড়িয়ে দিলাম। ম্যাগনিফায়িং কাঁচে অনেকক্ষণ নেড়ে-চেড়ে হাতের তালু দেখতে থাকলেন। — “ভাইয়া, আপনার হাতের রেখা তো অন্য কথা বলছে। এই যে এই রেখাটি লক্ষ্য করুন, এটা তালুর নীচ থেকে উপরের দিকে যাচ্ছে, কী বুঝলেন? এটাই বিদেশ” গণকের মন্তব্য। রেললাইনের মতো সমান্তরাল দুই রেখাকে ভেদ করে চলে যাওয়া একটি ছোট্ট রেখা দেখিয়ে এই মতামত দিলেন উনি। রেখাটি সোজা, তবে ছোট, বেশিদূর যায় নি। ভাবলাম, সিঙ্গাপুরও তো বেশি দূরে নয় চট্টগ্রাম থেকে!

২০০৫ সালের মে মাসের একদিন। আমি দি ডেইলি স্টারে। জামাল খানে অফিস। নীচের তলায় প্রথম আলো। রফিকুল বাহার এসে জানতে চাইলো, “বাচ্চু ভাই, আপনার পাসপোর্ট আছে? না থাকলে বানিয়ে নিন। যাবেন দেশের বাইরে?” যাবো না মানে! ফুটপাতের ঐ জ্যোতিষের কথা মনে পড়ে গেল — অবশেষে ‘বিদেশ!’ ঐ প্রথম আমার বিদেশ ভ্রমণ। হোক না তা ঘরের কাছের ভারত। হাতের ভাগ্য-রেখাটি বেশি দূর যায় নি তো!

চার বছর পর। আবারও সেই মে মাস, ২০০৯ সাল। সকাল ১১/১১.৩০ হবে। ইস্পাহানি স্কুল থেকে মেয়েকে বাসায় এনে অফিসে যাবো। এমন সময় সহকর্মী ফটোগ্রাফার জোবায়ের সিকদারের (এখন আমেরিকার বোস্টন শহরের বাসিন্দা) ফোন — “বাচ্চু ভাই, আপনার ডিভি’র চিঠি এসেছে। যুগান্তরের শহীদুল্লাহ শাহরিয়ারের বড় ভাই সাইফুল (জিপিও-তে কর্মরত) চিঠিটি উনার জিম্মায় রেখেছেন। আপনিও আমেরিকা যাচ্ছেন।” এর আগে মার্চ মাসে জোবায়েরের ডিভি লেটার এসেছে এবং তা রিসিভ করি আমি। আমার ও সহধর্মিনীর একটু ‘দ্বিধা’ হলো — “কেমনে কী? একই অফিস থেকে দুইজন ডিভি (ডাইভার্সিটি ভিসা) পাবে!” ছুটে গেলাম অফিসে। শাহরিয়ার তাঁর বাইকে নিয়ে গেল জিপিও-তে। চিঠিটি নিলাম। তখনও বিশ্বাস হচ্ছিলো না। জীবনসঙ্গীনি ডেইজি’কে ফোন করলাম। হঠাৎ কী মনে করে হাতের রেখার দিকে চোখ গেল, বহুদিন তাকাইনি। সেই ছোট্ট রেখাটি কখন যে আরো লম্বা হয়ে একটা ‘বাঁক’ নিয়েছে, তা খেয়ালও করিনি। কলকাতামুখী সোজা রেখাটি বাঁক নিয়ে ও ‘রুট’ পরিবর্তন করে এবং আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে এতোদূর চলে আসবে — স্বপ্নেও ভাবিনি।
আজ থেকে ১০ বছর আগে, ২০১০ সালের ২০ জুন রবিবার কুয়েত এয়ারওয়েজের ফ্লাইটে মধ্যরাতে চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আমাদের যাত্রা শুরু হয়। কুয়েতে দুই ঘন্টার ট্রানজিট। এরপর বড় আকারের অন্য এক বিমানে ২০ জুন বিকেলে নিউইয়র্কের জেএফকে এয়ারপোর্ট। সন্ধ্যায় ডেল্টা এয়ারলাইন্সের কানেকটিং ফ্লাইট নিয়ে আমাদের মূল গন্তব্য মিশিগানের ডেট্রয়েট শহরে পৌঁছার শিডিউল ছিলো। কিন্ত জেএফকে’তে ইমিগ্রেশন প্রসেসিংয়ে দেরী হওয়ায় ফ্লাইট মিস করি। রাতে জেএফকে’র কাছে হোটেলে নিয়ে রাখা হয়। পরদিন সকালে ডেল্টায় মিশিগানে, ছোট ভাইয়ের বাসায়। আরে তিন মাস পর ২০১০ এর সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্ক শহরে এসে থিতু হওয়া।

ছোটবেলায় ইউরোপ, আমেরিকা তথা ‘বিদেশ’ নিয়ে একধরণের ফ্যাসিনেশন ছিলো। আত্মীয়-স্বজনেরা ছবি পাঠাতেন। বিমুগ্ধ আমি তাকিয়ে থাকতাম। লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস ব্রীজ, নিউইয়র্কের স্ট্যাচু অফ লিবার্টি বা এমপায়ার স্টেট বিল্ডিং, ওয়াশিংটন ডিসি’র হোয়াইট হাউস, সান ফ্রান্সিসকো’র গোল্ডেন গেট ব্রীজ, প্যারিসের আইফেল টাওয়ার, সুইজারল্যান্ডের আল্পস পর্বত, চীনের প্রাচীর — এসবের ছবিতে চোখ আটকে থাকতো সেই কৈশোর থেকে, স্বপ্ন দেখতাম ‘যেতে হবে আমাকেও!’

আরেকটা বিষয় খুব ভাবাতো ‘মানুষ কেন মাইগ্রেশন করে?’ — ভাগ্যান্বেষণ? একঘেঁয়েমি? দেশ বিদেশ চেনা ? নতুন দেশ আবিষ্কারের নেশা? হয়তো সবগুলো কারণই সত্য। ছাত্রজীবনে পড়েছি “ঘর হইতে দুই পা ফেলিয়া/ দেখা হয় নাই চক্ষু মেলিয়া।” এতেও অনেকে প্রভাবিত বা উদ্বুদ্ধ হতে পারেন। পাঁচশ বছর আগে ইতালীয় নাবিক এডমিরাল ক্রিস্টোফার কলম্বাস আটলান্টিক পাড়ি দিয়ে আমেরিকা এসেছিলেন ‘ভিন্ন’ কারণে — স্পেনিশ উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা। তাঁর দেখানো পথ ধরে ‘আমেরিকা’ হয়ে ওঠে ইউরোপীয় নাগরিকদের কাঙ্খিত ড্রিমল্যান্ড এবং পরে ধীরে ধীরে এশীয় ও আফ্রিকানদের স্বপ্নভূমি।

গুগল জানাচ্ছে এক চমকপ্রদ তথ্য। প্রাক-আধুনিক যুগে, ১ দশমিক ৭৫ মিলিয়ন (১৭ লাখ ৫০ হাজার) বছর আগে আফ্রিকার হোমো ইরেক্টাসরা (Homo erectus) মনুষ্য মাইগ্রেশনের সূচনা করে, তাঁদের গন্তব্য ছিলো ইউরেশিয়া।১ লাখ ৫০ হাজার বছর আগে মানুষ বা হোমো সেপিয়েন্সরা (Homo sapiens) পুরো আফ্রিরাজুড়ে বসত গড়ে। এখান থেকে কিছু অংশ ১ লাখ ২৫ হাজার বছর আগে এশীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। আর ১৫ থেকে ২০ হাজার বছর আগে শুরু হয় আমেরিকায় মাইগ্রেশন।

গত ১০ বছর আমেরিকায় থেকে কী পেলাম বা পেলাম না, সেই ব্যালান্স শিট বা কথিত ‘ড্রিমল্যান্ড’ আমি কখনও খোঁজার চেষ্টা করিনি। অর্থ-বিত্তের পেছনেও ছুঁটিনি। তবে যখন পেছন ফিরি বা বর্তমানে তাকাই, তখন তা যেমন আনন্দ, সুখ ও সন্তুষ্টির উপাখ্যান মনে হয় — তেমনই কিছু বেদনার মিশ্রণও। একটি আপাত নিরাপদ, নিরুপদ্রব, টেনশনমুক্ত, সুশৃংখল, শান্তিপূর্ণ জীবন যাপন করছি। সন্তানরা ঘরের বাইরে গেলে তেমন উদ্বিগ্ন হতে হয় না। আর বেদনার বিষয়? একটাই — নিজের মা’সহ অনেক স্বজন ও ছোট-বড় প্রিয় মানুষকে চিরদিনের জন্য হারানো এবং নিজের মাতৃভূমি ‘বাংলাদেশ’ আর প্রিয় শহর ‘চট্টগ্রাম’কে মিস করা।

কলম তুলে নেওয়ার আগে একটু! গত ক’দিন আমার ব্রুকলিনের বাসার ছাদে ও গাছের ডালে চড়ুই পাখির দিনভর কিচির মিচির শব্দ শুনছি। সবচেয়ে আশ্চর্য এই, আমরা যখন ঘুম থেকে জাগি, তখন থেকেই শুরু হয় পাখিগুলোর আনন্দ ধ্বনি। সূর্যাস্ত পর্যন্ত চলে তাদের এই হই-হুল্লোড়। আমাদের চট্টগ্রামের কাপাসগোলার বাসায়ও প্রতিদিন ছিলো একই চিত্র। চট্টগ্রাম আর নিউইয়র্কের এমন ঐকতান হলো কী করে? চড়ুইগুলো কী তবে মাইগ্রেট করে উড়ে এলো …!!

(সংবিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ: গণক বা জ্যোতিষ বিদ্যায় ভুলেও আকৃষ্ট, মোহিত বা প্রভাবিত হবেন না।)#

লেখক : যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী কলামিস্ট, সাংবাদিক

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

Loading...