ওমান প্রেক্ষিত : মাস্ক এবং শাস্তি

0

বিশ্বের বহু দেশেই সংক্রমণ ঠেকানোর একটি জনপ্রিয় ব্যবস্থা হচ্ছে মাস্ক ব্যবহার। বিশেষ করে চীনে, যেখান থেকে শুরু হয়েছে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা, সেখানেও মানুষ বায়ুর দূষণের হাত থেকে বাঁচতে হরহামেশা নাক আর মুখ ঢাকা মুখোশ পরে ঘুরে বেড়ায়।

করোনাভাইরাস ছড়ানো প্রতিরোধে মুখ ঢেকে রাখার গুরুত্ব দিন দিন বাড়ছে। মাস্ক পরার পক্ষে কথা বলা বিজ্ঞানীরা জানেন, সাধারণ মানুষ কেবল মাস্ক পরে করোনাভাইরাসকে পরাস্ত করতে পারবে না। কিন্তু তাদের যুক্তি, ভাইরাসটির বিপক্ষে লড়ার কার্যকর ও বাড়তি একটি অস্ত্রমাস্ক। আর শেষ পর্যন্ত এতে সায় দিয়েছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)।

ডব্লিউএইচও বলছে জনসমাগমের এলাকাতেও সবার মাস্ক পরে থাকা উচিত কারণ তা মুখ থেকে বের হওয়া ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জলকণার মাধ্যমে ভাইরাসের ছড়িয়ে পড়া রোধ করতে পারে।

ডব্লিউএইচও সাধারণ মানুষদের পরতে বলছে কাপড়ের মাস্ক। মেডিকেল মাস্ক কেবল স্বাস্থ্যসেবা কর্মীদের জন্য সংরক্ষণ থাকা উচিত বলে তারা পরামর্শ দিচ্ছে। তবে ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তি যাদের শারীরিক অবস্থা খারাপ তারা নিজেদের ভালোভাবে সুরক্ষার জন্য মেডিকেল গ্রেডের মাস্ক ব্যবহার করতে পারেন বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

ওমানে শুরু থেকেই করোনাভাইরাস প্রতিরোধ বেশ সফলতার সঙ্গে এগিয়ে যায়। জিসিসিসহ মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলির মধ্যে এখানে করোনাক্রান্ত ও প্রাণহানির সংখ্যা সবার নিচে ছিল। করোনা প্রাদূর্ভাব প্রতিরোধে দেশটির সুপ্রিম কমিটি দূর্দান্ত পারফরমেন্স দেখিয়ে যাচ্ছে। তবে দুঃখের সঙ্গে বলতে হয় মানুষের অসচেনতার কারণে সাম্প্রতিক সময়ে এসে করোনা সংক্রামণ হঠাৎ করে বেড়ে যায়। অসচেনতার মূলেই রয়েছে সতর্কতামূলক প্রতিরোধ ব্যবস্থা হিসেবে প্রাকাশ্যে মাস্ক ব্যবহার না করা।

ওমানের পত্রপত্রিকার খবরে জানা যায়, গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ওমানে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা মারাত্মক হারে বেড়ে চলেছে। প্রতিদিন এক থেকে দেড়হাজার পজেটিভ রিপোর্ট আসছে। বুধবার সকাল পর্যন্ত গত ২৪ ঘন্টার মধ্যে নতুন আক্রান্ত ১ হাজার ১০ জন। আর গেল তিন সপ্তাহে প্রায় ৪৫ হাজার আক্রান্ত হয়েছে। বুধবার ওমানের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী সুলতানাতে কোভিড-১৯ আক্রান্তের ৫০ হাজার ছাড়িয়েছে।

ওমানের বুধবার সকাল পর্যন্ত করোনায় মোট মৃত্যুর সংখ্যা ২৩৩ জনে দাঁড়িয়েছে, এর মধ্যে গত ছয় দিনেই মারা গেছেন ৪৯ জন। মৃতের সংখ্যাও গত দুদিন ধরে আগের তুলনায় বেড়েছে৷ তবে সুস্থতার হার খুবই ভাল, এ পর্যন্ত ৩২ হাজার জন করোনাক্রান্ত সুস্থ হয়েছেন।

আক্রান্তের দিকে তুলনামূলকভাবে এতোদিন প্রবাসীরা এগিয়ে থাকলেও বর্তমানে ওমানিদের সংখ্যা বেশি। গত ১০ দিনে ৮ হাজার ৫০০ ওমানি এবং ৩ হাজার ৩০০ জন প্রবাসী করোনাক্রান্ত হয়েছেন বলে সরকারি পরিসংখ্যানে এসেছে।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে ওমানের সুপ্রিম কমিটি। কমিটি এতটাই উদ্বিগ্ন যে ভাইরাসের সংক্রমণ বিস্তার রোধে জরিমানা ও শাস্তি বাড়ানোর পাশাপাশি স্বাস্থ্যবিধি লঙ্ঘনকারীদের নাম ও ছবি জনসম্মুখে প্রকাশের ঘােষণা দিয়েছে। অথচ এই দেশে বড় অপরাধীরও ছবি প্রকাশের কোন রীতি নেই।

সংবাদ মাধ্যমে সুপ্রিম কমিটি জানায়, এই ভাইরাসের কারণে গেল কয়েকদিনে সালতানাতের বিভিন্ন প্রদেশে সংক্রমণ এবং মৃত্যুর সংখ্যা বাড়তে থাকায় কমিটি অত্যন্ত উদ্বিগ্ন। তারা লক্ষ্য করেছে যে কর্তৃপক্ষের দ্বারা নির্ধারিত সতর্কতামূলক নির্দেশনার প্রতি অনেকেই বেশ উদাসীন। এ কারণে কর্মক্ষেত্রে কিংবা ঘরে আত্মীয় স্বজন, সহকর্মী, এলাকার বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে আক্রান্ত বেড়ে গেছে। তাই কমিটি এখন থেকে নির্দেশনা অমান্যকারীদের নাম ও ছবি বিভিন্ন প্রচার মাধ্যমে প্রকাশ করে শাস্তি দিবে।

সুপ্রিম কমিটির সিদ্ধান্ত ও নির্দেশনা অনুসারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষগুলো গণস্বাস্থ্যের বিষয়কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে বিভিন্ন আইন ও ধারা জারি করছে। তারই ধারাবাহিকতায় গতকাল মঙ্গলবার আইন বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে জানানো হয় যে, কর্মক্ষেত্র (ফ্যাক্টরি, অফিস, দোকান ইত্যাদি), পাবলিক প্ল্যাটফর্ম এবং পাবলিক ট্রান্সপোর্টে ফেস মাস্ক না পরার জন্য ১০০ ওমানি রিয়াল (প্রায় ২২০০০ টাকা) জরিমানা করা হবে। আগামী ১৫ জুলাই ২০২০ ইং থেকে কঠোরভাবে আইনটি কার্যকর করা হবে। আগেএই অপররাধের জরিমানা ২০ রিয়াল ছিল ।

বুঝা যাচ্ছে, ১৫ জুলাইয়ে আগ পর্যন্ত আইন শৃঙ্খলাবাহিনী সতর্কবার্তা ও মৃদু জরিমানা দিয়ে যাবে। মাস্ক না পড়ে প্রাইভেট গাড়িতে একা একজন হওয়া সত্বেও সতর্ক করার পাশাপাশি ২০ ওমানি রিয়াল জরিমানা করার বিষয়ও দুজন ভুক্তভোগী আজ জানিয়েছেন। পুলিশের একটি বিশেষ ব্রাঞ্চ সাদা পোষাকে বিষয়টি মনিটরিং করার বিষয়ও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সেরকম একাধিক খবর আমাদের কাছে এসেছে।

ওমানে সকল প্রবাসী বাংলাদেশিদের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে মেনে চলার জন্য আহবান করা যাচ্ছে। নির্ধারিত স্থানগুলো ছাড়াও প্রকাশ্যে মাস্ক ব্যবহার করবেন। মাস্ক না পরে যদি ১০০ রিয়ালের জরিমানার ভার নিতে হয়, তবে করোনার এই দুর্দিনে তা কিভাবে সাধারণ প্রবাসী হিসেবে বহন করতে পারবেন তা ভাবনায় রাখুন। কাজেই মাস্ক ছাড়া ঘর থেকে বের হওয়ার চেষ্টা করবেন না।

লেখক : ইন্টারপ্রেটার, জেনারেল ডিপার্টমেন্ট অফ কোর্টস, ওমান

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।