এক পরিবার, তিন ‘বাবা’, ২৬৪ সুবিধাভোগী : কুয়েতের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় নাগরিকত্ব জালিয়াতি
কুয়েতের ন্যাশনালিটি ইনভেস্টিগেশনস ডিপার্টমেন্ট দেশটির ইতিহাসের অন্যতম বড় ও জটিল নাগরিকত্ব জালিয়াতির ঘটনা উদ্ঘাটন করেছে। প্রায় ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে চলা এই জালিয়াতিতে একটি পারস্য উপসাগরীয় দেশের (জিসিসি) তিন সহোদর ভাই ভিন্ন ভিন্ন কুয়েতি পরিচয়ে বসবাস করছিলেন। এই ঘটনায় মোট ২৬৪ জন ব্যক্তি, যার মধ্যে সন্তান ও নাতি-নাতনিরাও রয়েছে, সরাসরি সুবিধাভোগী ও প্রভাবিত হয়েছেন।
জিসিসিতে ভাই, কুয়েতে অপরিচিত
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, নিজ দেশে এই তিনজন ছিলেন একই বাবা, দাদা ও পারিবারিক নামের অধিকারী সহোদর ভাই। কিন্তু কুয়েতে এসে তারা প্রত্যেকে ভিন্ন ভিন্ন কুয়েতি বাবার সন্তান হিসেবে নিবন্ধিত হন এবং আলাদা তিনটি পরিবারের সঙ্গে নিজেদের যুক্ত করেন। ফলে কাগজে-কলমে তারা একে অপরের সঙ্গে সম্পূর্ণ অপরিচিত ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত হন।
২০০৬ সালে প্রথম সন্দেহ
২০০৬ সালে প্রথমবার এই জালিয়াতির বিষয়টি সামনে আসে। অভিযুক্তদের একজনের (চিহ্নিত নাম “A”) ছেলে ইরানে একটি আর্থিক ও আইনি মামলায় জড়িয়ে পড়েন। এতে কুয়েতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে যোগাযোগ শুরু হয়।
তদন্তের সময় তেহরানে কুয়েত দূতাবাস জানতে পারে, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কুয়েতি নাগরিকত্বের পাশাপাশি আরেকটি উপসাগরীয় দেশের নাগরিকত্বও বহন করছেন। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র কুয়েত কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়।
পুনরায় ফাইল খোলা ও বড় সত্য উদ্ঘাটন
পরবর্তীতে নাগরিকত্ব সংক্রান্ত সন্দেহজনক ফাইল পুনরায় খতিয়ে দেখতে গিয়ে তদন্তকারীরা লক্ষ্য করেন—উপসাগরীয় দেশে তিন ভাইয়ের পূর্ণ নাম এক, কিন্তু কুয়েতে তাদের নাম ও পারিবারিক পরিচয় সম্পূর্ণ আলাদা। তদন্তকারীরা এই ঘটনাকে বর্ণনা করেন— “উপসাগরে ভাই, কুয়েতে অপরিচিত।”
প্রথম অভিযুক্ত “A” ও ৮৬ জন পরিবারের সদস্য
“A”-এর রয়েছে ২১ জন সন্তান। তদন্তে দেখা যায়, তার সব সন্তানই কুয়েতি ও উপসাগরীয়—দুই দেশের নাগরিকত্ব বহন করছেন। ডিএনএ পরীক্ষায় প্রমাণ হয়, কুয়েতে যাদের তার ভাই বলা হচ্ছিল, তারা আসলে তার আত্মীয় নন। “A” বর্তমানে পলাতক এবং তার ফাইলে মোট ৮৬ জন নির্ভরশীল ব্যক্তি রয়েছেন।
দ্বিতীয় অভিযুক্ত “M” ও ১১৫ জন পরিবারের সদস্য
দ্বিতীয় অভিযুক্ত “M”-এর জালিয়াতি ধরা পড়ে একটি সরকারি হটলাইনে দেওয়া অভিযোগের মাধ্যমে। তার নাম ও পারিবারিক পরিচয় কুয়েত ও উপসাগরীয় দেশে পুরোপুরি আলাদা পাওয়া যায়। ডিএনএ পরীক্ষায় নিশ্চিত হয়—তিনি কুয়েতে যে পরিবারের সন্তান হিসেবে পরিচিত, তাদের সঙ্গে তার কোনো রক্তের সম্পর্ক নেই। তার ফাইলে মোট ১১৫ জন ব্যক্তি প্রভাবিত হয়েছেন।
তৃতীয় ভাই ও ৬৩ জন জন পরিবারের সদস্য
তৃতীয় ভাই ২০২৫ সালের শুরুতে কুয়েত ছাড়েন। তার এক সন্তানের নাগরিকত্ব আগেই বাতিল করা হয়েছিল ভিন্ন নামের সরকারি নথি পাওয়ার পর। ডিএনএ পরীক্ষায় এখানেও জালিয়াতির প্রমাণ মেলে। এই মামলায় মোট ৬৩ জন সুবিধাভোগী রয়েছেন।
ডিএনএ পরীক্ষায় চূড়ান্ত প্রমাণ
তিন অভিযুক্তের সন্তানদের ডিএনএ পরীক্ষায় প্রমাণ হয়—তারা সবাই কাজিন, অর্থাৎ তাদের বাবারা প্রকৃতপক্ষে সহোদর ভাই। এতে প্রায় অর্ধশতক ধরে লুকিয়ে থাকা এই জালিয়াতির পূর্ণ সত্য প্রকাশ পায়।
কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বর্তমানে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলছে।


