আকাশে হাসান-সাউদার ব্যতিক্রমী বিয়ের গল্প

প্রথম আলো

0

বরের নাম খায়রুল হাসান, কনে সাউদা বিনতে সানজিদা। কানাডাপ্রবাসী এই দুজনের পরিচয় বিশ্ববিদ্যালয়জীবনে। পরিণয় হলো ২৯ মে। আর বিয়ের কাজটা তাঁরা সেরেছেন আকাশে। বরের কাছে ব্যতিক্রমী এই বিয়ের গল্প শুনেছেন সজীব মিয়া, তুলে ধরেছেন প্রথম আলোতে।

Travelion – Mobile

বিশ্ববিদ্যালয়জীবনের শেষ দিকে সাউদার (বিনতে সানজিদা) সঙ্গে আমার পরিচয়। আমি ছিলাম ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসনের ছাত্র আর সে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মাসিতে পড়ত, আমাদের দুই বছরের জুনিয়র। ক্যাম্পাস ছেড়ে আসার পরও তার সঙ্গে যোগাযোগ থাকল।

২০১৮ সালে কানাডায় চলে যাই। পড়াশোনা শেষ করে কানাডার ডিজিটাল মার্কেটিং সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান থ্রাইভ ডিজিটালে কাজ নিই। এর মধ্যে ২০১৯ সালে সাউদাও কানাডা চলে যায়। বায়োটেকনোলজি বিষয়ে মাস্টার্স শেষ করে একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করে।

একই দেশের দুই শহরে থাকি। দুজনের যোগাযোগটা বাড়ে। একসময় বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিই আমরা। নিজেদের এ সিদ্ধান্তের কথা পরিবারকে জানাই আমরা। পরিবার থেকে সবুজসংকেত আসে। তারপরই অনেক দিনের অপূর্ণ একটা স্বপ্নপূরণের তোড়জোড় শুরু করি। যে স্বপ্নের কথা সাউদা আগে থেকেই জানত—উড়োজাহাজে বিয়ে।

বিমানেই সম্পন্ন হয়েছে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা ছবি: সংগৃহীত
বিমানেই সম্পন্ন হয়েছে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা ছবি: সংগৃহীত

ছোটবেলা থেকেই আমার যানবাহনপ্রীতি। কোন বাহন কীভাবে তৈরি হয়, চলে কোন প্রযুক্তিতে, সুবিধা-অসুবিধা কী—এসব নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করতাম আর বিস্ময়ে বিহ্বল হতাম। উড়োজাহাজের বিভিন্ন মডেল, চালনার পদ্ধতি, কোন যন্ত্রাংশের কী কাজ, বিভিন্ন সময় সংঘটিত দুর্ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদন নিয়ে পড়াশোনা করতাম। আশপাশের মানুষের সঙ্গে গল্প করতাম। পাইলট হওয়ার স্বপ্ন দেখা সে বয়সে কল্পনার শামিল ছিল। তাই দুধের স্বাদ ঘোলে মেটাতে অন্য কিছু করতাম। যেমন একবার ক্লাসের অ্যাসাইনমেন্ট করার জন্য বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর জেনারেল ডিউটি পাইলটের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। এই সব করতে করতেই একসময় মাথায় এল আচ্ছা প্লেনে বিয়ে করলে কেমন হয়?

প্লেনে বিয়েটা বাইরে ডালভাত হয়ে গেলেও আমাদের দেশে এখন নতুন। জানতাম, আয়োজন করাটা সহজ হবে না। তাই কানাডায় থাকতেই দেশের এয়ারলাইনসের সঙ্গে যোগাযোগ করি। কিন্তু সাড়া মেলে না।

পয়লা মে আমরা দেশে আসি। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের সঙ্গে যোগাযোগ করি। তাদের কাছ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাই। আমাদের পরিকল্পনাটা তাদের অন্য রকম মনে হয়। বেশ কিছু প্রশাসনিক নিয়মনীতি অনুসরণ করতে হয়। সেসব ধাপ সম্পন্ন হলে বিমান থেকে চূড়ান্তভাবে জানানো হয়—২৯ মে বেলা সাড়ে তিনটায় ঢাকা থেকে সিলেটগামী ফ্লাইটে আমাদের বিয়ে হবে।

amar lab – mobile

ঢাকার রাস্তায় বের হতে হলে যানজটের হিসাব করেই বের হতে হয়। নির্ধারিত সময়ের বেশ আগেই আমরা বরপক্ষ ধানমন্ডি থেকে রওনা দিই। ওদিকে মিরপুর থেকে রওনা দেয় কনেপক্ষ। সবার গন্তব্য শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। দুই পক্ষের ১৬ জন আমরা। সঙ্গে আছেন পরিচিত কাজি ওমর ফারুক।

পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে খায়রুল হাসান ও সাউদা বিনতে সানজিদা ছবি: সংগৃহীত
পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে খায়রুল হাসান ও সাউদা বিনতে সানজিদা ছবি: সংগৃহীত

বর-কনের সাজপোশাকে দুজন মানুষকে দেখে বিমানবন্দরে কানাঘুষা শুরু হয়ে যায়। বিষয়টি জানার পর অনেকে আমাদের ছবিও তোলেন। এদিকে বিমান বাংলাদেশের আন্তরিক অভ্যর্থনা পেয়ে নিজেকে সত্যিকার অর্থেই ‘জামাই’ মনে হচ্ছিল! কোনো দিন ভিভিআইপি মর্যাদায় কোথাও যাওয়ার সুযোগ হয়নি, সেদিন সে সুযোগ পেয়ে নিজেকে বিশেষ একজন মনে হচ্ছিল।

বিমানের অভ্যন্তরীণ স্টেশন ম্যানেজার এ জে এম মাহবুবুর রহমান নিজ দায়িত্বে আমাদের বোর্ডিং করান। বিমানের পক্ষ থেকে আমাদের সঙ্গে যোগ দেন জনসংযোগ বিভাগের স্বাধীন অধিকারী। যথাসময়ে বিমানের ড্যাশ-৮ এয়ারক্রাফটটি টেক-অফ করে। মোটামুটি ১৫ হাজার ফুট ওপরে সিটবেল্ট সংকেত বন্ধ হলে কাজি দাঁড়িয়ে থেকে বিয়ের কাজ সম্পন্ন করেন। আমার আর সাউদার নতুন এক পরিচয় তখন—স্বামী-স্ত্রী। আকাশে ভেসে বিয়ে, সে এক অসাধারণ অনুভূতি, আনন্দের ক্ষণ! সে আনন্দের মাত্রা বাড়িয়ে দেন প্লেনের অন্য যাত্রীরা।

অনেকের মনে হতে পারে, আমাদের বাড়ি বুঝি সিলেট। তা নয়, আমাদের দুজনের কারও পৈতৃক বাড়িই সিলেট নয়। আমার চাঁদপুরে, সাউদার নোয়াখালী। বিমানে আয়োজনের সুবিধার কথা ভেবে এই গন্তব্য ঠিক করা হয়েছিল।

বিমানে ওঠার মুহূর্তে খায়রুল হাসান ও সাউদা বিনতে সানজিদা ছবি: সংগৃহীত
বিমানে ওঠার মুহূর্তে খায়রুল হাসান ও সাউদা বিনতে সানজিদা ছবি: সংগৃহীত

সেদিন সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে আমরা গিয়েছিলাম লাক্কাতুরা চা–বাগানে। বাংলাদেশের অন্যতম বৃহত্তম চা–বাগানে দুজনে ছবি তুলি। কানাডায় আমি থাকি ভ্যাঙ্কুভারের রিচমন্ড এলাকায়। কাকতালীয়ভাবে সেদিন চা-বাগান থেকে আমরা চলে যাই সিলেটের রিচমন্ড হোটেলে। কিছুক্ষণ অবস্থান করে পরিবারের সবাই পানসি রেস্টুরেন্টে খাওয়াদাওয়া করি। রাতেই আমরা ঢাকার উদ্দেশে বাসে উঠি। তবে অনেকে এসেছেন ট্রেনে ও ফ্লাইটে।

বিমানে বিয়ের খবরটি জানাজানি হয়ে গেলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। নিকটজনেরাও ব্যতিক্রমী আয়োজনের জন্য ফোনে শুভকামনা জানান। অনেকে খরচের পরিমাণ জানতে চাইছেন। তাঁদের বলি, বিয়ের আয়োজনে খুব বেশি অর্থ খরচ হয়নি। তবে পরিকল্পনার কাজটি ছিল জটিল। বিশেষ করে, পরিবারের সদস্যদের বোঝানো আর এয়ারলাইনসের সঙ্গে সমন্বয় করা।

আলোচনা কিংবা লোকদেখানোর জন্য কিন্তু আমরা বিয়ের আয়োজন করিনি। এটা আমার স্বপ্ন ছিল। তবে স্বপ্নপূরণের সঙ্গে আলোচনার জন্ম দিয়ে ভালোই লাগছে।

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

আপনার মন্তব্য লিখুন