অসহায় প্রবাসীর আর্তনাদ, কখন টের পাবে বাংলাদেশ!

0

মাস্কাট শহর। আল-খোয়াইর। ঘড়িতে বিকেল সাড়ে পাঁচটা। করোনায় সব লকডাউন। নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্য ও ফার্মেসি ছাড়া তেমন কিছু খোলা নেই। তাই মানুষের আনাগোনা খুবই কম।

রাস্তার পাশে গাড়ি পার্ক করেছি, ফার্মেসি থেকে কিছু ওষুধ নেওয়ার জন্য। নামার আগে দেখি এক ভদ্রলোক পাশে দাঁড়িয়ে আছে কথা বলার জন্য। দেখে বুঝতে পেরেছি বাংলাদেশি। খুব অসুস্থ মনে হলো, গাড়ির কাঁচ নামিয়ে কিঞ্চিৎ বের করে জিজ্ঞাসা করলাম ভাই, কি হয়েছে?

কোনো উত্তর না দিয়ে লোকটি অজর ধারায় চোখের পানি ফেলতে শুরু করল এবং একটা হাত আমার দিকে বাড়িয়ে দিল অপর হাতে দেখলাম একটি ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন। তখন বুঝে গেলাম সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে।

বললাম, “ভাই কি হয়েছে?

কান্নায় কন্ঠে বলল, “স্যার, আমি আপনাকে চিনি, আমি বখতিয়ার, চট্টগ্রামের ছেলে, আপনার বন্ধু রাশেদ ভাইয়ের গ্রামের বাসিন্দা। আপনি আমাকে চিনার কথা না, আমি আল-খোয়াইর রাওয়াসকোর সামনে থাকি। একটি কোম্পানিতে চাকরি করতাম। ভালোই চলছিল জীবন। আজ তিন মাস হয়ে গেছে কোম্পানি বন্ধ। আমার চাকরি নেই। অনেক কষ্টে আছি। তিন মাস আগে যা বেতন পেয়েছি দেশে পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছি।”

প্রশ্ন রাখলাম, কোথাও থেকে ত্রাণ পাননি।

“দুই মাস আগে আপনাদের সমিতি (চট্টগ্রাম সমিতি ওমান) থেকে এক পরিচিত বন্ধুর মাধ্যমে এক মাসের ত্রাণসামগ্রী পেয়েছিলাম, রমজানের মাঝামাঝিতেই শেষ হয়ে যায়। রুমের মধ্যে আটজন থাকি। সবার একই অবস্থা কারো কাছ থেকে সাহায্য পাওয়ার কোন উপায় নেই। অনেক কষ্টে বিস্কিট খেয়ে পানি খেয়ে মাঝেমধ্যে একবেলা খেয়ে কোন রকমে বেঁচে আছি।”

এক নাগাড়ে বলতে লাগলেন বখতিয়ার, “গত সপ্তাহ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়লাম। প্রচন্ড গায়ের জ্বর, অনেক কষ্ট করে গতকাল সন্ধ্যায় একজন ডাক্তারের কাছ থেকে বিনা ফি তে একটি প্রেসক্রিপশন নিয়েছি, জ্বর মেপে দেখল ১০২ ডিগ্রি আমাকে কিছু ওষুধ লিখে দিয়েছে। আমার পকেটে এক টাকাও নাই ঔষধ কিনার জন্য। অনেকের কাছে ধরনা দিয়েছি। কেউ একটা টাকাও দিতে পারে নি। সবারই অবস্থা খারাপ। এই এলাকায় আমার মত অনেক মানুষ না খেয়ে অসুস্থ অবস্থায় রুমে পড়ে আছে। কেউ কাউকে দেখার কোন উপায় নেই। তার মধ্যে অনেকেই করোনায় আক্রান্ত।”

প্রশ্ন রাখলাম, “আপনি করোনা পরীক্ষা করেছেন, ওমান সরকার তো প্রবাসীর জন্য বিনামূল্য পরীক্ষার ব্যবস্থা করেছে।

বখতিয়ার বললেন,”গত সপ্তাহে সেন্টারে গিয়ে করোনা টেস্ট করিয়েছিলাম। পয়সা লাগেনি। আল্লাহর রহমতে করোনা নেগেটিভ এসেছে।”

এখন তাহলে ওষুধ লাগছে, জানতে চাইলাম।

“আমি জানি এ দেশে ভিক্ষা করা অপরাধ কিন্তু জীবন বাঁচানোর জন্য বাধ্য হয়ে কোন উপায় না দেখে রাস্তায় আসলাম। জীবনে কোনদিন ভাবিনি এমন দিনও আসবে, আমি মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান আট বছর ধরে ওমানে আছি। কিছু পড়াশোনাও করেছি, এমন একটি কঠিন সময় আমাদেরকে দেখার কেউ নেই।” কথাগুলি বলতে বলতে দুচোখ বেয়ে পানির ধারা নেমে আসল তার ।

আমি আর নিজেকে সামলাতে পারিনি। পাশে বসা আমার স্ত্রীর দিকে চেয়ে দেখলাম, মলিন চেহারা দুচোখে পানি আর অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে শুনতে ছিল আমাদের কথাগুলো। গাড়ির পিছনের সিটে ছিল আমার নয় বছরের অবুঝ সন্তান। তাকিয়ে দেখলাম অবাক চোখে কি যেন বুঝার চেষ্টা করছে!

যাক বখতিয়ারকে সাধ্যমত সহযোগিতা করে ফার্মেসি থেকে ওষুধপত্র কিনে দিয়ে নিজের জন্য ওষুধ নিয়ে গাড়িতে বসলাম। প্রবাসী ভাইটিকে বিদায় দিয়ে, গাড়িস্টার্ট দিয়ে সামনের দিকে এগুতেই, আবার হাত দেখালো, আবার চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে বলল, “আপনার এই ঋণ আমি কোনদিন শোধ করতে পারব না। জানিনা জীবনে আর কখনো দেখা হবে কিনা। আমার বাঁচার আশা কম। দেশে আমার মা, স্ত্রী, এক ছেলে, এক মেয়ে নিয়ে আমার একটি ছোট্ট সংসার। ওরাও এখন দেশে না খেয়ে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। আমি বিদেশ থাকি বলে স্থানীয় মেম্বার চেয়ারম্যান কোন সাহায্য দেয় না, ওরা মনে করে আমি অনেক টাকাওয়ালা। ”

“আমার মত অনেক সারা ওমানে অনেক বাংলাদেশি আছেন যারা মৃত্যুর সাথে প্রতিদিন যুদ্ধ করে যাচ্ছে। আপনার কাছে হাতজোড় করে একটি অনুরোধ জানাচ্ছি, জীবনের শেষ ইচ্ছে, যদি পারেন দূতাবাস এবং সরকারকে বলে আমাদেরকে দেশে পাঠিয়ে দেন, আমি আমার মা, প্রিয়তমা স্ত্রী, সন্তানদের সামনে, প্রিয় মাতৃভূমিতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করতে চাই।”

একেবারে শেষ কথায় বুকটা আমার কাপুনি দিয়ে ওঠল,”আর যদি মরে যাই আমার লাশটা যেন পরিবারের কাছে পৌঁছে, অন্তত সে ব্যবস্থাটা করে দিবেন। শুনেছি টাকার অভাবে অনেক প্রবাসী লাশ মর্গে পড়ে আছে। আমি জানি আপনারা প্রবাসীদের জন্য অনেক কাজ করেন, অনেকের লাশ দেশে পাঠিয়েছেন। আমারও জন্য একটু দেখবেন।”

বললাম, আপনার মোবাইল নাম্বার দিন। মোবাইল নম্বরটি সেইভ করে গাড়ি সামনের দিকে বাড়ালাম। লুকিং গ্লাসে দেখলাম, অশ্রু ভেজা চোখে এক জায়গাতেই দাঁড়িয়ে আছেন মৃত্যুকে আলিঙ্গনের অপেক্ষায় থাকা আমার প্রবাসী ভাইটি। গাড়ির আয়নায় দেখি, এখনো লোকটি দাঁড়িয়ে আছেন। অবাক চোখে তাকিয়ে আছেন আমাদের গাড়ির দিকে।

আমার নয় বছর বয়সী ছেলের ততক্ষণে অনেক প্রশ্ন: আচ্ছা, উনার বাচ্চারা কোথায়? বাচ্চাদের মা কোথায়? উনি কি এখানে থাকেন? ওনার এত অসুখ কেন? উনার কাছে টাকা নেই কেন? উনি বাংলাদেশে যায় না কেন?

আমার কাছে আর স্ত্রীর মুখে কোনো জবাব নেই। মনটা কেমন বিষণ্ণতায় ছেয়ে গেছে। স্ত্রী পাশের সিটে বসে টিসু দিয়ে বার বার চোখের পানি মুছতে ছিল।

বাসার সামনে গাড়ি পার্ক করে বাসায় ঢুকলাম। আমার ছেলে স্বভাবগত একটু দুষ্ট প্রকৃতির। দুষ্টামিতেই তার সারাবেলা কাটে। করোনার লকডাউন জীবনে তা আরও বেড়েছে। কিন্তু দেখলাম একদম চুপচাপ, কি জানি ভাবতে ভাবতে নিজের তার রুমে ঢুকে গেল।

আমার স্ত্রী সোফায় বসে আনমনা তাকিয়ে আছে। আমি সোজা রুমে গিয়ে বিছানায় শুয়ে বালিশ চাপা দিলাম, কিছুতেই চোখের পানি ধরে রাখতে পারছিলাম না।

হাজারো প্রশ্ন উঁকি দিচ্ছে মনের ভিতর, ভাবছিলাম আমার মত একজন সাধারণ শ্রমিক হয়ে ভাগ্য পরিবর্তনের আশায় প্রিয়জনকে ছেড়ে এসেছিল স্বপ্নের শহরে। আল্লাহর অশেষ রহমতে আমি সফল হয়েছি, আরও অনেকে হয়েছেন। কিন্তু তার বেশি হাজারো প্রবাসীর স্বপ্নের অপমৃত্যু হয়েছে। আবার করােনাকালে মধ্যবিত্ত অনেক প্রবাসিতে রাস্তায় নামিয়ে এনেছে বখতিয়ারের মতাে। অথচ এই রেমিট্যান্সযোদ্ধারা জীবনের মায়া ছেড়ে কঠোর পরিশ্রমে আয় করে দেশে পাঠিয়ে অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে যাচ্ছে।

আজ তাদের এই বিপদের সময় কেউ পাশে নেই। আমি একজন সামাজিক কর্মী হিসাবে সাধ্যমত চেষ্টা করেছি সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বোঝানোর জন্য। কে শুনে কার কথা, বলার কোনো ভাষা নেই। বড় মায়া হচ্ছিল এই অসহায় প্রবাসীদের জন্য। হয়তো অনেক প্রবাসীর জীবন নিভে এই করোনাকালে!

 স্কেচ : আয়াত ইয়াছিন (৯ বছর)
স্কেচ : আয়াত ইয়াছিন (৯ বছর)

ঠিক দুই ঘন্টা পর ছেলে আমার রুমে এসে তার হাতের আঁকা একটি ছবি দিল বলল, “বাবা এটা দেখো”। আমি অবাক চোখে অনেকক্ষণ ছবিটির দিকে চেয়ে থাকলাম। ওষুধের দোকান, এম্বুলেন্স, আমাদের গাড়ি আর ভিখারীরুপী প্রবাসী- একেবারে জীবন্ত করে ফুটিয়ে তুলেছে বিকেলের সেই মন ভেঙ্গে দেওয়া স্মৃতি।

চিন্তায় আসল শুধু একটা বিষয়ই, একজন অসহায় প্রবাসীর জন্য অবুঝ শিশুর অন্তরে যে অনুভূতি জাগল ……..কখন টের পাবে প্রিয় বাংলাদেশ!

লেখক : সভাপতি, চট্টগ্রাম সমিতি ওমান এবং সাংগঠনিক সম্পাদক, এনআরবি সিআইপি এসোসিয়েশন

যখনই ঘটনা, তখনই আপডেট পেতে, গ্রাহক হয়ে যান এখনই!

আপনার মন্তব্য লিখুন

আপনার ইমেইল ঠিকানা প্রকাশিত হবে না।